সেলিনা হোসেন: যে ঔপন্যাসিক উপন্যাসে তুলে ধরেন নদী, নারী আর যুদ্ধের জটিল সম্পর্ক
সেলিনা হোসেন
বাংলা সাহিত্যের আধুনিক পর্বে যে কজন ঔপন্যাসিক তাদের সময়ের চেয়েও বেশি কিছু দেখেছেন এবং তাঁদের উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন একটি জাতির আবেগ, স্বপ্ন ও সংগ্রাম, সেলিনা হোসেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। যিনি ষাটের দশকে আবির্ভূত হয়েই বাংলা উপন্যাসে নিয়ে এলেন এক নতুন মাত্রা। তিনি যেমন উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, শ্রেণি সংগ্রাম ও ইতিহাসকে দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন, তেমনি তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারপারসন। তাঁর কলমে যেমন ধরা পড়েছে নদী ও যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস, তেমনি ফুটে উঠেছে নারীর অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সমাজের নানা বৈষম্য।
শৈশব ও শিক্ষা: রাজশাহীর মাটিতে শিকড়
১৯৪৭ সালের ১৪ই জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজশাহীতে এক শিক্ষিত ও প্রগতিশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সেলিনা হোসেন । পিতা এ. কে. মোশাররফ হোসেন ছিলেন রেশম চাষের বিশেষজ্ঞ, মাতা মারিয়াম-উন-নেসা ।
ছোটবেলায় পিতার চাকরির সুবাদে তিনি বগুড়ার গান্দাগ্রামে বড় হন। সেখানে ১৬টি কুঁড়েঘরের বিশাল আঙিনায় গ্রামীণ প্রকৃতি, করতোয়া নদী আর গাছপালার মাঝে কেটেছে তাঁর শৈশব । এই শৈশবের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল। তিনি নিজেই বলেছেন, “গ্রামটি ছিল প্রকৃতির সব সৌন্দর্যে সজ্জিত—সবুজের সমারোহ, বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত আর জলাশয়” ।
বাবা-মা ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল। পঞ্চাশের দশকে যখন বাল্যবিবাহ ছিল সাধারণ ব্যাপার, তখন তাঁরা সেলিনার বড় দুই বোনকে টাঙ্গাইলের ভরতেশ্বরী হোমসে পাঠিয়েছিলেন পড়াশোনার জন্য । মা মারিয়াম-উন-নেসা মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতেন এবং নিজে মাত্র প্রাথমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত হলেও মেয়েদের লেখাপড়ার পক্ষে ছিলেন । পরিবারের এই পরিবেশই তাঁর মনে নারীর অধিকার ও লিঙ্গসমতার বীজ বপন করেছিল ।
তিনি লতিফপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বগুড়ার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন । রাজশাহী উইমেন্স কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন তিনি । ১৯৬৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৬৭ সালে স্নাতক ও ১৯৬৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন ।
সাহিত্যযাত্রার সূচনা: গল্প দিয়ে শুরু, উপন্যাসে প্রতিষ্ঠা
মাত্র ১৭ বছর বয়সে—১৯৬৪ সালে—তিনি প্রথম সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন এবং ছোটগল্প ও বিতর্ক-সহ ছয়টি বিষয়ে প্রথম পুরস্কার পান । ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ, যা থেকে তাঁর পথচলা শুরু হয় ।
১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘জলচ্ছাস’ । তারপর ১৯৭৩ সালে ‘জোছনায় সূর্য জ্বলা’ । কিন্তু তাঁর সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে—‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ ।
‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’: মুক্তিযুদ্ধের এক অমর দলিল
‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ সেলিনা হোসেনের সবচেয়ে পরিচিত উপন্যাস। এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত । উপন্যাসটির নাম থেকেই বোঝা যায়—হাঙ্গর (শোষক), নদী (বাংলার জীবনধারা) আর গ্রেনেড (যুদ্ধের ধ্বংসাত্মকতা)—এই তিন উপাদানের মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ তাঁর উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন, “সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে শ্রেণি সংগ্রাম, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও নারী—এই বিষয়গুলোকে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন” । এই উপন্যাসটি পরবর্তীতে চলচ্চিত্রায়িতও হয়েছে ।
আরও উল্লেখযোগ্য রচনা
সেলিনা হোসেন এ পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি উপন্যাস, ১৫টি ছোটগল্প সংকলন, ১২টি প্রবন্ধ সংকলন এবং অসংখ্য শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা করেছেন ।
তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে:
| গ্রন্থের নাম | প্রকাশসাল |
|---|---|
| জোছনায় সূর্য জ্বলা | ১৯৭৩ |
| হাঙ্গর নদী গ্রেনেড | ১৯৭৬ |
| নীল ময়ূরের যৌবন | ১৯৮৩ |
| পোকা মাকরের ঘর বসতি | ১৯৮৬ |
| নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি | ১৯৮৭ |
| গায়ত্রী সন্ধ্যা | ১৯৯৬ |
| ভূমি ও কুসুম | ২০১০ |
‘ভূমি ও কুসুম’ উপন্যাসটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—এটি বাংলা সাহিত্যে ছিটমহল সমস্যা নিয়ে রচিত প্রথম উপন্যাস । এই বিষয়টি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে আর কারও লেখা নেই। সেলিনা হোসেনের উপন্যাসগুলোর আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি গবেষণা করে লেখেন। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং তারপর লেখেন ।
ছোটগল্প ও প্রবন্ধ
তাঁর উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প সংকলনগুলোর মধ্যে রয়েছে:
তিনি নারী ও লিঙ্গবিষয়ক ১৫টি বই সম্পাদনা করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘জেন্ডার বিশ্বকোষ’ ।
সম্মাননা: সর্বোচ্চ পুরস্কারের অধিকারী
সেলিনা হোসেন বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারেই ভূষিত হয়েছেন:
তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তিনটি বেসামরিক পুরস্কার—বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার—পেয়েছেন, যা অত্যন্ত বিরল সম্মাননা ।
প্রশাসনিক দায়িত্ব
শুধু সাহিত্যিক নন, তিনি একজন দক্ষ প্রশাসকও। তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন । ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারপারসন ছিলেন । ২০২২ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সালের ১৭ই অক্টোবর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন ।
তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য এবং ইউনেস্কোর নির্বাহী বোর্ডে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন ।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
সেলিনা হোসেনের রচনা বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, রুশ, ফরাসি, জাপানি, কোরিয়ান, ফিনিশ ও মালয়—সহ একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে । তাঁর ইংরেজি অনূদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘The Plumed Peacock’, ‘Warp and Woof’, ‘The Shark, the River, the Grenade’, এবং ‘River of My Blood’ । প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের ক্যাটালগেও তাঁর ‘River of My Blood’ উপন্যাসটি স্থান পেয়েছে ।
পূর্ববর্তীহুমায়ূন আহমেদ: বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পকার, যে একাই সৃষ্টি করেছিল এক মহাবিশ্ব
পরবর্তী দক্ষ ও উৎপাদনশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে টিভিইটি (TVET)-কে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য করার আহ্বান জাতীয় সংলাপে
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
