হুমায়ূন আহমেদ: বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পকার, যে একাই সৃষ্টি করেছিল এক মহাবিশ্ব
হুমায়ূন আহমেদ
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের আলোচনা করতে গেলে ভাষা যেন থমকে দাঁড়ায়। কারণ, তাঁরা নিছক লেখক নন—তাঁরা এক একটি প্রতিষ্ঠান, এক একটি যুগ, এক একটি অনুভূতি। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন তেমনই এক ব্যক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের পর বাংলা সাহিত্যে যাঁর নাম সর্বোচ্চ উচ্চারণে ধ্বনিত হয়, তিনি এই অসম্ভব প্রতিভার অধিকারী । যাঁর কলম থেকে বেরিয়েছে দুই শতাধিক বই, যাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো আজও বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে আছে, যাঁর নাটক ও চলচ্চিত্র বাংলার সংস্কৃতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে—তিনিই হুমায়ূন আহমেদ । তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সবচেয়ে প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক । ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে 'বাংলা ভাষায় গত এক শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক' বলে অভিহিত করেছিলেন । এক কথায়, তিনি বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পকার, যিনি একাই বাংলা সাহিত্যের ভুবনে এক নতুন জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন। চলো, এই মহাবিশ্বকে জানি, প্রতিটি অণু-পরমাণুতে ডুব দিই।
শৈশব ও শিক্ষা: রসায়নশাস্ত্রের ছাত্র যে স্বপ্ন দেখত গল্পের
১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের মৌলভী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ । পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পিরোজপুর জেলার একজন ডেপুটি পুলিশ সুপার, যিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হন । মাতা আয়েশা ফয়েজ ছিলেন একজন গৃহিণী ।
ছোটবেলায় তাঁর বাবার চাকরির সুবাদে সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, দিনাজপুরসহ দেশের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন হুমায়ূন । চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা শুরু করলেও ১৯৬৫ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেন । এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা কলেজে, সেখান থেকে এইচএসসি পাস করেন ।
এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন । কিন্তু থেমে থাকেননি তিনি। পলিমার রসায়নে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যান এবং সেখান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন । দেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন । রসায়ন তাঁর পেশা ছিল, কিন্তু প্রাণ ছিল সাহিত্যে।
প্রথম উপন্যাস: ‘নন্দিত নরকে’র আগুন
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে, যখন দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লিপ্ত, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হুমায়ূন আহমেদ লিখে ফেলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ । এটি ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের মাধ্যমেই তিনি বাংলা সাহিত্যের বুকে অভিষেক ঘটান ।
আহমদ ছফার উদ্যোগে খান ব্রাদার্স পাবলিশার্স থেকে বইটি প্রকাশিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই এটি সাড়া ফেলে দেয় । সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন, হতাশা, ভালোবাসা আর দৈনন্দিন জীবনের সরল ও সাবলীল চিত্রায়ণ পাঠককে মুগ্ধ করে । তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’ সেই ধারাকে আরও শক্তিশালী করে । এভাবেই শুরু হয় সেই পথচলা, যা শেষ হয়েছিল দুই শতাধিক বইয়ের মহাকাব্যে ।
বাংলা সাহিত্যে বিপ্লব: সাধারণের গল্পে অসাধারণের সন্ধান
হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি বাংলা সাহিত্যে সরল ও প্রাঞ্জল কথ্য ভাষায় সাধারণ মানুষকে বলার ধারা চালু করেছিলেন । জটিল অলংকার বা দুর্বোধ্য প্রতীকের বদলে তিনি ব্যবহার করেছিলেন দৈনন্দিন জীবনের ভাষা। এই কারণেই তাঁর লেখা কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণ, সকল শ্রেণির পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে ।
ইন্ডিয়ান সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে ‘গত একশ বছরে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক’ আখ্যা দিয়েছিলেন । ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের বইয়ের বাজারে ভারতীয় লেখকদের আধিপত্য ছিল। হুমায়ূন আহমেদ প্রায় একক হাতে সেই আধিপত্য ভেঙে দেন এবং বাংলা সাহিত্যে নতুন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন । সাহিত্য সমালোচকরা মনে করেন, তাঁর সাহিত্য এখনও আরও ৫০ থেকে ১০০ বছর টিকে থাকবে, কারণ মানুষের জীবনকে পড়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর মধ্যে ।
কল্পনার জগৎ: হিমু, মিসির আলী, শুভ্র
হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টি করেছিলেন কিছু কালজয়ী চরিত্র । যাঁরা বাংলা সাহিত্যের চরিত্রদের মধ্যে অমর হয়ে আছেন:
হিমু: 'হিমু' সিরিজের মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন এক উদ্ভট, স্বপ্ন-বিলাসী, অদ্ভুত প্রকৃতির তরুণ, যে সমাজের বাঁধাধরা নিয়মকে উপেক্ষা করে নিজস্ব আইনে জীবনযাপন করে । হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি আর ঢোলা চুল বাংলার তরুণ প্রজন্মের কাছে আইকনিক হয়ে ওঠে। হিমুকে নিয়ে তিনি ১৫টিরও বেশি উপন্যাস রচনা করেছিলেন ।
মিসির আলী: অন্যদিকে মিসির আলী ছিলেন এক বিশ্লেষণধর্মী, যুক্তিবাদী অধ্যাপক, যিনি রহস্য ও জাদুবাস্তবতার জটিল জাল ভেদ করতে পারতেন । মিসির আলীকে নিয়ে তিনি ১৯টি উপন্যাস ও ১১টি ছোটগল্প রচনা করেছিলেন ।
শুভ্র: শুভ্র চরিত্রটিও ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়, যে মধ্যবিত্তের সাধারণ মানুষ থেকে কীভাবে নিজের গন্তব্য খুঁজে পায়, তার গল্প । শুভ্রকে নিয়ে ৬টি উপন্যাস রয়েছে ।
বেকার ভাই: তাঁর সৃষ্টি করা সবচেয়ে আলোচিত চরিত্রগুলোর মধ্যে বেকার ভাই অন্যতম । চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া এক অলস, কিন্তু ভালো মানুষের প্রতীক ছিলেন তিনি। ‘কথাও কেউ নেই’ নাটকে বেকার ভাইয়ের ফাঁসির দৃশ্য দেখে গোটা দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, এবং তাঁর মুক্তির জন্য দোয়া-মোনাজাতও করা হয় ! এই ঘটনা প্রমাণ করে, বাস্তবের চেয়েও তাঁর কল্পিত চরিত্রগুলো কতটা বাস্তব হয়ে উঠেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি: রক্ত আর ভালোবাসার গল্প
হুমায়ূন আহমেদ শুধু রোমান্স আর রহস্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ওপরও অসাধারণ সব উপন্যাস রচনা করেছিলেন । 'অগ্নের পরশমনি', 'শ্রাবণ মেঘের দিন', 'মাতাল হাওয়া', 'পাপ ১৯৭১', 'জোছনা ও জননীর গল্প', 'দেয়াল' প্রভৃতি গ্রন্থগুলো মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত তাঁর অসাধারণ সব সৃষ্টি । এই উপন্যাসগুলোতে যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসের সঙ্গে ভালোবাসা, হারানোর বেদনা আর বেঁচে থাকার লড়াই—সবকিছুই এক সুন্দর বুননে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র: ছোটপর্দা থেকে রুপালি পর্দায় এক বিরাট সাম্রাজ্য
শুধু বইয়ের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বাংলা টেলিভিশন নাটকের এক নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন ।
টেলিভিশন নাটকের এক নতুন ধারা
১৯৮৩ সালে তাঁর প্রথম টেলিভিশন নাটক ‘প্রথম প্রহর’ প্রচারিত হয় । তারপর ১৯৮৫ সালে ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ প্রচার শুরু হয়, যা বাংলা টিভি নাটকের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে রয়েছে । এরপর একে একে:
কথাও কেউ নেই (১৯৯০): শহুরে মানুষের একাকিত্বের কাহিনি; এই নাটকে বেকার ভাই চরিত্রের জন্য সবার মনে দাগ কেটে যায়
নক্ষত্রের রাত (১৯৯৬)
আজ রবিবার (১৯৯৯)
বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) এই নাটকগুলোর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে পশ্চিমবঙ্গের দর্শকরাও সেগুলো দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠতেন ।
চলচ্চিত্র নির্মাণ: জাতীয় পুরস্কারের ঝুলি
তিনি তাঁর নিজের গল্পের ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছিলেন । তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘অগ্নের পরশমনি’ (১৯৯৪) একসঙ্গে আটটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছিল পূর্ববর্তী হুমায়ূন আজাদ: যে বিদ্রোহী কলম ভাষাকে রক্ষা করেছিল আর সমাজকে প্রশ্ন করেছিল সেলিনা হোসেন: যে ঔপন্যাসিক উপন্যাসে তুলে ধরেন নদী, নারী আর যুদ্ধের জটিল সম্পর্ক
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
