'লেডি বার্ড' (২০১৭) : একটি সিনেমা, যা পালিয়ে যাওয়ার গল্প বলে, আবার ফিরে তাকানোর গল্পও বলে
Editorial Team২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:০০ AM২ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

কলেজে ঢোকার আগে প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে একটা কথা ঘুরপাক খায়—আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাব। এই পরিবার, এই এলাকা, এই পরিচিত সবকিছু ছেড়ে কোথাও অনেক দূরে চলে যাব, যেখানে কেউ আমাকে চেনে না, যেখানে আমি নতুন করে নিজেকে তৈরি করতে পারব। এই অনুভূতিটাই Greta Gerwig পরিচালিত 'লেডি বার্ড' (২০১৭) সিনেমার মূল কথা। কিন্তু এই সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি শুধু পালিয়ে যাওয়ার গল্প বলে না, বরং পালিয়ে যাওয়ার পর ফিরে তাকানোর গল্পও বলে।
সিনেমার ঘটনা ঘটে ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে, ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাক্রামেন্টো শহরে। প্রধান চরিত্র ক্রিস্টিন ম্যাকফারসন, যে একটি ক্যাথলিক গার্লস স্কুলে শেষ বর্ষে পড়ে। সে তার আসল নাম পছন্দ করে না, সবাইকে নিজের নাম 'লেডি বার্ড' বলে ডাকতে বলে। এই নামটা সে নিজে নিজেকে দিয়েছে, যেন নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করতে চায়। তার পরিবার খুব সাধারণ, খুব একটা সচ্ছল নয়। বাবা চাকরি হারিয়েছেন, মা হাসপাতালে দুই শিফটে নার্সের কাজ করেন, বড় ভাই আর তার প্রেমিকা বাড়িতে এসে গাদাগাদি করে থাকেন। লেডি বার্ডের জীবনে বড় একটাই স্বপ্ন—স্যাক্রামেন্টো ছেড়ে পূর্ব উপকূলে, বিশেষ করে নিউইয়র্কে, কলেজে পড়া।
মা-মেয়ের সম্পর্ক: সিনেমার আসল হৃদয়
পুরো সিনেমাটা যদি একটি শব্দে বর্ণনা করতে হয়, তাহলে সেটা হবে 'মা-মেয়ে'। লেডি বার্ড আর তার মা মারিয়নের সম্পর্ক এই সিনেমার আসল হৃদয়। মারিয়ন একজন কঠিন, স্পষ্টভাষী, সন্তানদের প্রতি একটুও ছাড় না দেওয়া মহিলা। তিনি একটি মানসিক হাসপাতালে কাউন্সেলর হিসেবে কাজ করেন, সারাদিন অন্যদের ভেঙে পড়া দেখেন, কিন্তু বাড়িতে ফিরে পান একটি কাঁটাযুক্ত মেয়ে। মা-মেয়ে যখন একসাথে থাকেন, তখন দুইটা অবস্থাই হয়—হয় তারা এত কাছাকাছি যে একজনের মতো, নয়তো পরের সেকেন্ডে এত ঝগড়া যে কেউ কথা বলতে চায় না। এই পরিবর্তন এত দ্রুত হয় যে বোঝা মুশকিল।
সিনেমার একটা দৃশ্য সবাই বারবার মনে রাখে—মা-মেয়ে একসাথে সেকেন্ড হ্যান্ডের দোকানে কেনাকাটা করছেন, এক সেকেন্ড আগে একে অপরের পোশাকের প্রশংসা করছেন, পরের সেকেন্ডে একটা কথায় সব তালা মেরে দিচ্ছেন। আবার সিনেমার শুরুর দৃশ্যটা ভাবুন—দুজন গাড়িতে বসে জন স্টাইনবেকের 'দ্য গ্রেপস অব র্যাথ' এর অডিওবুক শুনছেন, দুজনেই শেষের অংশে কেঁদে ফেলেন। কিন্তু কথা যখন কলেজ নির্বাচনে আসে, লেডি বার্ড চলন্ত গাড়ি থেকে দরজা খুলে লাফ দেয়, হাত ভেঙে যায়। এই কাজটা শুনতে বাড়াবাড়ি মনে হয়, কিন্তু যারা দেখেছেন তারা জানেন—একজন সতেরো বছরের মেয়ে এভাবে বলছে, "তুমি আমার কথা শুনছ না।" সিনেমার সবচেয়ে কষ্টের সংলাপ আসে মারিয়নের মুখ থেকে: "আমি চাই তুমি তোমার সেরা সংস্করণ হও।" লেডি বার্ড পাল্টা প্রশ্ন করে, "যদি এটাই আমার সেরা সংস্করণ হয়?"
লেডি বার্ড চরিত্রটি: অপছন্দনীয়, কিন্তু বাস্তব
লেডি বার্ড কোনও ঐতিহ্যবাহী অর্থে 'ভালো মেয়ে' নয়। সে মিথ্যা বলে, বন্ধুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, বান্ধবী জুলিকে ফেলে দিয়ে আরেক ধনী মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করে, একটা ছেলের সাথে প্রেম করার সময় আরেকজনের প্রতি আগ্রহ দেখায়। তার অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সে মিথ্যা বলে, বাবার বেকারত্ব লুকায়, নিজের ঠিকানা ছোট করে বলে। সে কখনও কখনও নিজের ছোট ভাইয়ের প্রতি অসহিষ্ণু, মায়ের প্রতি নির্দয়, নিজের প্রতি অকারণে নিরাশ।
কিন্তু এই সব দোষ থাকা সত্ত্বেও দর্শক তাকে পছন্দ করতে বাধ্য হয়, কারণ সে বাস্তব। সে এমন একটা মেয়ে, যাকে আমরা সবাই চিনি—হয় নিজের ভেতরে, নয়তো নিজের বন্ধুদের মধ্যে। সে নিজেকে খুঁজতে গিয়ে ভুল করে, খেয়াল করে, তারপর আবার চেষ্টা করে। এই সততা সিনেমাটিকে বিশেষ করে তোলে। হার্ড ফিল্ম স্কুলে বা অন্য কোথাও ভুল নেই—গারউইগ এই চরিত্রটিকে কোনো মোহ ছাড়াই, কিন্তু কোনো রায় ছাড়াও দেখিয়েছেন।
ক্যাথলিক স্কুল, বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা
স্যাক্রামেন্টোর ক্যাথলিক স্কুলের পরিবেশ সিনেমাতে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। সিস্টার সারা জোনাস, যিনি স্কুলের কঠিন কিন্তু দয়ালু অধ্যক্ষ, তিনি লেডি বার্ডকে চ্যালেঞ্জ করেন—"তুমি আমাকে বোঝাও, তুমি কেন নিউইয়র্কে যেতে চাও। এটা কি শুধু পালানো নয়?" এই প্রশ্নটা লেডি বার্ডের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এবং সিনেমাটা এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না, শুধু দর্শকের সামনে রাখে।
বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সিনেমাটা দুটো সত্য দেখায়। জুলি স্টিফেনস—লেডি বার্ডের প্রথম বন্ধু, যিনি মোটা, হাসিখুশি, গণিত প্রতিভাবান, এবং গোটা সিনেমাটায় সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ—তার সাথে লেডি বার্ডের সম্পর্ক কখনও কখনও তিক্ত হয়, কারণ লেডি বার্ড বড় হতে গিয়ে জুলিকে ভুলে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুলিই থাকে। আর প্রেমের ক্ষেত্রে লেডি বার্ড দুইটা ছেলের সাথে জড়িয়ে পড়ে—ড্যানি, যিনি ধর্মপরায়ণ, কিন্তু তার একটা গোপন রহস্য আছে, এবং কাইল, যিনি বিশ্বাস করেন জ্ঞান শুধুমাত্র বই থেকে আসে না। কিন্তু দুই সম্পর্কই শেষ হয়, কারণ লেডি বার্ড নিজেই জানে না সে আসলে কী চায়।
প্রম (Prom): সিনেমার সবচেয়ে সৎ দৃশ্য (Honest Scene)
সিনেমার সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে Honest Scene হলো প্রম এর। স্কুলের বার্ষিক প্রম অনুষ্ঠানে লেডি বার্ড তার নতুন ধনী বন্ধুদের সাথে যায়, কিন্তু সেই রাতে সে বুঝতে পারে, যে জীবন সে এত চেয়েছিল, সেটা এত সুন্দর নয় যতটা সে ভেবেছিল। সে কাইলকে সাথে নিয়ে প্রম ছেড়ে চলে যায়, আর তারপর তার জীবনের প্রথমবার নিজের সিদ্ধান্ত নেয়—নিজের আসল বন্ধু জুলির কাছে ফিরে যায়। এই দৃশ্যটা দেখায়, বড় হওয়ার মানে সবচেয়ে জনপ্রিয় হওয়া না, সবচেয়ে সৎ হওয়া।
নিউইয়র্ক: স্বপ্ন থেকে বাস্তব
সিনেমার শেষ অংশে লেডি বার্ড নিউইয়র্কে যায়, কিন্তু সেখানে গিয়ে তার স্বপ্নের গল্প এত সহজ হয়ে যায় না। তার প্রথম কলেজ পার্টিতে, কেউ জিজ্ঞেস করে তাকে স্যাক্রামেন্টো থেকে এসেছে কি না, সে মিথ্যা বলে। কিন্তু একই রাতে সে ফোন করে তার বাবা-মাকে, গাড়ি চালাতে গিয়ে হারিয়ে যায়, আর ক্যাথলিক গির্জায় বসে কাঁদে। এই দৃশ্যগুলোতে বোঝা যায়, পালানো মানেই মুক্তি না। বড় হওয়ার মানে নিজের শিকড় চিনতে পারা, সেগুলোকে ভুলে না যাওয়া।
সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য শেষে আসে—লেডি বার্ড ফোন করে তার মাকে, বলে, "আমি তোমাকে ভালোবাসি, ধন্যবাদ।" এই দুই লাইনে পুরো সিনেমার যোগফল। মা-মেয়ের সম্পর্ক, তর্ক, দূরত্ব—এসব কিছুর পরেও একটা কথা থেকে যায়, আর সেটা হলো ভালোবাসা।
কলেজে ঢোকার আগে কেন এই সিনেমা দেখা উচিত
লেডি বার্ড সিনেমাটা কলেজে ঢোকার আগে দেখা উচিত কারণ এটা একদম নিজের গল্পের মতো। এই সিনেমা দেখাবে, পরিবার মানে শুধু ভালোবাসা না, পরিবার মানে জটিলতা, রাগ, অভিমান, আর তবুও টিকে থাকা। বন্ধুত্ব মানে সব সময় পাশে থাকা না, বন্ধুত্ব মানে ভুল করার পর ফিরে আসার জায়গা থাকা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই সিনেমা শেখাবে—নিজের নাম নিজে দেওয়ার মধ্যে একটা বড় শক্তি আছে, কিন্তু সেই নামের পেছনের মানুষটাকে চিনতে পারা তার চেয়েও বড় কাজ।
শেষ কথা
'লেডি বার্ড' শুধু একটা টিনএজ সিনেমা নয়, এটা একটা সৎ সিনেমা। এটি কলেজে ঢোকার আগে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটা প্রশ্ন করে—তুমি আসলে পালাতে চাও, নাকি খুঁজতে চাও? উত্তরা দুইটা আলাদা, এবং দুটোই দরকারি। কিন্তু পার্থক্যটা জানতে পারাটাই বড় হওয়ার প্রথম ধাপ। কিছু সিনেমা বড় হওয়ার গল্প বলে, আর কিছু সিনেমা বড় হতে শেখায়।
পূর্ববর্তী
'গুড উইল হান্টিং' (১৯৯৭): একটি সিনেমা, একটি জীবনদর্শন
পরবর্তীDead Poets Society (1989) : একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের মতো করে বাঁচতে
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
'হুইপল্যাশ' (২০১৪) : সাফল্যের আসল দাম
খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য পার্কস অব বিং আ ওয়ালফ্লাওয়ার' (২০১২): একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের গল্প বলার সাহস

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য পার্সুইট অব হ্যাপিনেস' (২০০৬): একটি সিনেমা, যা শেখায় হাল ছাড়া যাবে না

খেলাধুলা ও বিনোদন
'বয়হুড': একটি সিনেমা, যা বারো বছরে তৈরি
খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক' (২০১০) : সাফল্যের পেছনের অন্ধকার দিক

খেলাধুলা ও বিনোদন
Dead Poets Society (1989) : একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের মতো করে বাঁচতে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
