Dead Poets Society (1989) : একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের মতো করে বাঁচতে
Editorial Team২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:০০ AM২ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন তাকে প্রশ্ন করতে হয়—আমি কি সত্যিই সেই পথে হাঁটছি, যে পথটা আমি চেয়েছিলাম? নাকি আমি শুধু সেই পথে হাঁটছি, যে পথটা সবাই আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে? এই প্রশ্নটাই পিটার উইয়ার পরিচালিত 'ডেড পোয়েটস সোসাইটি' (১৯৮৯) সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৫৯ সালের একটি রক্ষণশীল বোর্ডিং স্কুলে ঘটে যাওয়া এই গল্প আজও প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে সমানভাবে অনুরণিত হয়, কারণ এটি শেখায়—নিজের মতো করে বাঁচা মানে বিদ্রোহ করা না, নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাওয়া।
সিনেমার ঘটনা ঘটে ভার্মন্টের একটি অভিজাত প্রিপ স্কুল, ওয়েলটন একাডেমিতে। এই স্কুলের চারটি স্তম্ভ হলো—ঐতিহ্য, সম্মান, শৃঙ্খলা আর উৎকর্ষ। এখানে ভর্তি হয় নতুন ছাত্র নিল পেরি, যার বাবা চান সে ডাক্তার হবে, যদিও নিলের স্বপ্ন অভিনয়। তার সাথে থাকে টড অ্যান্ডারসন, যার বড় ভাইও এই স্কুলে পড়তেন, আর সে ভয়ে থাকে সে তার ভাইয়ের মতো ভালো করতে পারবে কি না। এদের সাথে যোগ হয় নক্স, চার্লি আর আরও কয়েকজন। এদের জীবনে আসেন নতুন ইংরেজি শিক্ষক জন কিটিং, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রয়াত রবিন উইলিয়ামস।
'কার্পে ডিয়েম': শুধু একটি সংলাপ নয়, একটি জীবনদর্শন
সিনেমার সবচেয়ে বিখ্যাত সংলাপ হলো 'কার্পে ডিয়েম'—অর্থাৎ 'আজকে কাজে লাগাও'। মিস্টার কিটিং প্রথম ক্লাসেই ছাত্রদের স্কুলের পুরনো ছবি দেখান, যেখানে অতীতের ছাত্ররা এখন মৃত। তিনি ফিসফিস করে বলেন, "তারা তোমাদের মতোই ছিলেন। তারা ভাবত তারা অমর। কিন্তু এখন তারা ফুলের সারি নিচে। শুনতে পাচ্ছ? কার্পে ডিয়েম। আজকে কাজে লাগাও, ছেলেরা। তোমার জীবন অসাধারণ করে তোলো।"
এই কথাটা শুধু একটি সংলাপ নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা অমূল্য—আজকের দিনটা যদি কাজে না লাগানো হয়, তাহলে কালকের দিনটা শুধু হারিয়ে যাওয়া দিনের হিসাব হবে। এই সিনেমা শেখায়, জীবন মানে শুধু পরীক্ষার নম্বর বা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা না, জীবন মানে প্রতিদিন কিছু নতুন করা, কিছু নতুন অনুভব করা।
রবিন উইলিয়ামস: একজন শিক্ষকের চিরন্তন প্রতিমূর্তি
মিস্টার কিটিং চরিত্রটি রবিন উইলিয়ামসের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয়। এই চরিত্রে তিনি শেখান, শিক্ষক মানে শুধু বই থেকে পড়ানো না, শিক্ষক মানে শিক্ষার্থীর ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা। কিটিং প্রথম দিনেই ছাত্রদের বইয়ের প্রথম পাতা ছিঁড়তে বলেন, কারণ তিনি চান তারা কবিতা যন্ত্রের মতো না বুঝে, হৃদয়ে বুঝুক। তিনি বলেন, "আমরা কবিতা পড়ি বা লিখি কারণ আমরা মানব জাতির অংশ। আর মানব জাতি আবেগে ভরা।"
কিটিং ক্লাসের বাইরে গিয়ে ছাত্রদের লাইন ধরে হাঁটতে শেখান, যেখানে প্রত্যেকে তার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে হাঁটবে। এই দৃশ্যটি সিনেমার অন্যতম সুন্দর মুহূর্ত, যা দেখায়—সবাই একভাবে হাঁটলে চলবে না, প্রত্যেকের নিজের হাঁটার ধরন আছে। শিক্ষক হিসেবে কিটিং কঠিন, কিন্তু তিনি কখনও শাসন করেন না, তিনি অনুপ্রেরণা দেন। এই জায়গাটাই তাকে সিনেমার ইতিহাসে একজন চিরন্তন শিক্ষক প্রতিমূর্তি করে তুলেছে।
ডেড পোয়েটস সোসাইটি: লুকিয়ে জেগে ওঠা
মিস্টার কিটিংয়ের প্রভাবে নিল, টড, নক্স আর চার্লি মিলে গোপনে একটি ক্লাব তৈরি করে—'ডেড পোয়েটস সোসাইটি'। এটা ছিল কিটিংয়ের ছাত্রজীবনের ক্লাব, যেখানে তারা রাতে গুহায় জড়ো হয়ে কবিতা পড়ত, কবিতা লিখত, আর নিজেদের ভাবনা শেয়ার করত। এই ক্লাবের গোপন নিয়ম ছিল—প্রথম সভায় যে কবিতা পড়ে, সে জগৎকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
এই ক্লাবটাই সিনেমার রূপক। এটা দেখায়, শিক্ষার্থীদের কেবল ক্লাসরুম নয়, নিজেদের প্রকাশের জায়গা দরকার। যখন তারা গুহায় বসে কবিতা পড়ে, তখন তাদের ভেতরের ভয়, স্বপ্ন, আর কষ্ট বেরিয়ে আসে। টড, যে কখনও কবিতা লিখত না, সে প্রথমবার কবিতা লেখে, আর তার কথাগুলো সবাই শুনে থমকে যায়। এই দৃশ্যটাই সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী মেসেজ—প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভেতরে একটি কণ্ঠ লুকিয়ে আছে, যাকে জাগাতে শুধু একজন বিশ্বাসী মানুষ দরকার।
নিল পেরি: ট্র্যাজেডির ছায়া
সিনেমার সবচেয়ে বেদনাদায়ক চরিত্র নিল পেরি, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন রবার্ট শন লিওনার্ড। নিলের বাবা চান সে হার্ভার্ডে গিয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু নিলের আসল স্বপ্ন অভিনয়। বাবার অনুমতি ছাড়াই সে 'এ মিডসামার নাইটস ড্রিম' নাটকে অভিনয় করে, আর সেই অভিনয়ে সফলও হয়। কিন্তু বাবা নাটক শেষে তাকে জোর করে মিলিটারি স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। নিল প্রতিবাদ করে, কিন্তু বাবা তাকে বুঝতে দেন না যে তার নিজের জীবন নিজের।
শেষে নিল আত্মহত্যা করে। এই দৃশ্যটি সিনেমার সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত। এটি দেখায়, যখন পরিবার সন্তানের স্বপ্নকে সম্মান করে না, তখন কী ভয়ংকর পরিণতি হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য এই অংশটি কঠিন কিন্তু জরুরি—পরিবারের সাথে কথা বলা, নিজের স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করা কতটা জরুরি, তা এটা শেখায়।
টড অ্যান্ডারসন: লাজুক ছেলেটির জাগরণ
সিনেমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র টড অ্যান্ডারসন, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইথান হক। টড শুরুতে প্রচণ্ড লাজুক, ভীতু, নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে না। তার বড় ভাই ছিলেন স্কুলের সেরা ছাত্র, আর টড মনে করে সে কখনও তার সমান হতে পারবে না।
কিন্তু কিটিং আর নিলের প্রভাবে টড ধীরে ধীরে বদলে যায়। সিনেমার শেষ দৃশ্যে, যখন কিটিংকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়, তখন টড প্রথমবার ক্লাসের টেবিলে দাঁড়িয়ে বলে, "ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!" এই দৃশ্যটি সিনেমার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত। একজন লাজুক ছেলে প্রথমবার প্রতিবাদ করে, আর সেই প্রতিবাদ শুধু তার শিক্ষকের জন্য নয়, নিজের জন্যও। এই দৃশ্যটি দেখায়, প্রকৃত শিক্ষক কখনও ভুলে যান না, আর প্রকৃত শিক্ষার্থী কখনও চুপ থাকে না।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই সিনেমা জরুরি
'ডেড পোয়েটস সোসাইটি' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা সামনে রাখে—তুমি কি নিজের মতো বাঁচছ, নাকি অন্যের প্রত্যাশা অনুযায়ী? এই সিনেমা শেখায়, বাবা-মায়ের কথা মানা আর নিজের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দেওয়া একই কথা নয়। সম্মান রেখেও নিজের কথা বলা যায়, যদি সাহস থাকে।
এই সিনেমা আরও শেখায়, শিক্ষা মানে শুধু ভালো ফলাফল করা না। শিক্ষা মানে নতুনভাবে চিন্তা করা, প্রশ্ন করতে শেখা, নিজের মত গড়ে তোলা। মিস্টার কিটিংয়ের ক্লাসে কেউ নম্বরের জন্য পড়ে না, তারা শেখার আনন্দে পড়ে। এই আনন্দটাই আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রায় হারিয়ে গেছে, আর এই সিনেমা সেই আনন্দকে মনে করিয়ে দেয়।
শেষ কথা
'ডেড পোয়েটস সোসাইটি' শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি একটি আহ্বান—কার্পে ডিয়েম, আজকে কাজে লাগাও। এটি শিক্ষার্থীদের শেখায়, জীবন ছোট, স্বপ্ন বড়, আর নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় সাহস। যদি কখনও মনে হয় পথটা ঠিক নেই, যদি কখনও মনে হয় নিজের স্বপ্ন চাপা পড়ে যাচ্ছে, তাহলে এই সিনেমাটা দেখুন। কারণ কিছু সিনেমা শুধু দেখা হয় না, কিছু সিনেমা বুকের ভেতরে গিয়ে বাসা বাঁধে। 'ডেড পোয়েটস সোসাইটি' সেই ধরনের একটি সিনেমা।
পূর্ববর্তী
'লেডি বার্ড' (২০১৭) : একটি সিনেমা, যা পালিয়ে যাওয়ার গল্প বলে, আবার ফিরে তাকানোর গল্পও বলে
পরবর্তী'দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক' (২০১০) : সাফল্যের পেছনের অন্ধকার দিক
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
'হুইপল্যাশ' (২০১৪) : সাফল্যের আসল দাম
খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য পার্কস অব বিং আ ওয়ালফ্লাওয়ার' (২০১২): একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের গল্প বলার সাহস

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য পার্সুইট অব হ্যাপিনেস' (২০০৬): একটি সিনেমা, যা শেখায় হাল ছাড়া যাবে না

খেলাধুলা ও বিনোদন
'বয়হুড': একটি সিনেমা, যা বারো বছরে তৈরি
খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক' (২০১০) : সাফল্যের পেছনের অন্ধকার দিক

খেলাধুলা ও বিনোদন
'লেডি বার্ড' (২০১৭) : একটি সিনেমা, যা পালিয়ে যাওয়ার গল্প বলে, আবার ফিরে তাকানোর গল্পও বলে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
