ডগলাস অ্যাডামসের 'দ্য হিচহাইকারস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি' (১৯৭৯): সায়েন্স ফিকশনের সবচেয়ে মজার বই
Best science fiction stories of all time
Editorial Team২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৩:০০ PM৯ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

একটি বই, যা মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর দেয়
সায়েন্স ফিকশন মানেই কি গম্ভীর, জটিল, আর দার্শনিক? ডগলাস অ্যাডামসের 'দ্য হিচহাইকারস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি' (১৯৭৯) প্রমাণ করে যে সায়েন্স ফিকশন হাসতে হাসতেও লেখা যায়। এটি এমন একটি বই, যা পড়তে পড়তে আপনি হাসবেন, কিন্তু হাসির আড়ালে জীবনের বড় বড় প্রশ্নও খুঁজে পাবেন। বইটি মূলত ১৯৭৮ সালে বিবিসি রেডিওতে সম্প্রচারিত একটি রেডিও কমেডি সিরিজ থেকে জন্ম নেয়, তারপর ১৯৭৯ সালে উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হয়। এরপর এটি একটি সাংস্কৃতিক ঘটনায় পরিণত হয়—টিভি সিরিজ, চলচ্চিত্র, ভিডিও গেম, এমনকি 'টাওয়েল ডে' নামে একটি আন্তর্জাতিক দিবসও তৈরি হয়।
গল্পটি শুরু হয় পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার মধ্য দিয়ে। আর্থার ডেন্ট নামের একজন সাধারণ ইংরেজ মানুষ, যিনি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন তার বাড়ি ভাঙার জন্য বুলডোজার এসেছে। তিনি রাস্তায় শুয়ে প্রতিবাদ করছেন, ঠিক তখনই তার বন্ধু ফোর্ড প্রিফেক্ট এসে তাকে বলেন—পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আর তাকে নিয়ে পালাতে হবে। ফোর্ড আসলে একজন মহাকাশচারী, যে পৃথিবীতে গবেষণার জন্য এসেছিল। ভোগনদের একটি নির্মাণ বহর পৃথিবী ধ্বংস করে দেয়, কারণ তারা একটি হাইপারস্পেস বাইপাস বানাতে চায়। আর্থার আর ফোর্ড কোনোভাবে একটি মহাকাশযানে উঠে পড়ে, আর শুরু হয় তাদের মহাবিশ্ব ভ্রমণ।
আর্থার ডেন্ট: একজন সাধারণ মানুষের মহাবিশ্ব ভ্রমণ
আর্থার ডেন্ট সায়েন্স ফিকশনের সবচেয়ে অসাধারণ চরিত্রদের একজন, কারণ সে অসাধারণ কিছুই না। সে একজন সাধারণ মানুষ, যে মহাবিশ্ব সম্পর্কে কিছুই জানে না, আর জ্ঞানও চায় না। সে শুধু চায় তার বাড়ি না ভাঙা হোক, আর এক কাপ চা পান করতে। কিন্তু মহাবিশ্ব তাকে একের পর এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে ফেলে—ভোগনদের নির্মাণ বহরে প্রায় মৃত্যু, ম্যাগ্রাথিয়ার হৃদয়ের সোনার হার চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত, আর মিলিসওয়ের রোবট মারভিনের সাথে কথা বলা।
শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থার চরিত্রটি শেখায়—সাধারণ হওয়া দোষ না। আর্থার নায়ক না, বিজ্ঞানী না, মহাকাশচারী না। সে শুধু একজন মানুষ, যে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। এই সাধারণত্বই তাকে দর্শকের কাছে প্রিয় করে তোলে।
ফোর্ড প্রিফেক্ট: একজন গবেষক, যে টাওয়েল ছাড়া কোথাও যায় না
ফোর্ড প্রিফেক্ট আর্থারের বন্ধু, যে আসলে একজন মহাকাশচারী গবেষক। সে 'দ্য হিচহাইকারস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি' নামের একটি ইলেকট্রনিক বই বহন করে, যা মহাবিশ্বের সব তথ্য ধারণ করে। ফোর্ডের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সে কখনও তার টাওয়েল ছাড়া কোথাও যায় না। 'দ্য হিচহাইকারস গাইড' অনুসারে, টাওয়েল হলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস—এটি দিয়ে কম্বল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, পাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, শিকার করতে ব্যবহার করা যায়, সংকেত দিতে ব্যবহার করা যায়, এমনকি টাওয়েল দিয়ে নিজেকে রক্ষা করা যায়।
শিক্ষার্থীদের জন্য ফোর্ড চরিত্রটি শেখায়—প্রস্তুতি সব সময় জরুরি। টাওয়েল রূপক হিসেবে প্রস্তুতির প্রতীক। জীবনে যাই আসুক, প্রস্তুত থাকলে টিকে থাকা যায়।
ম্যাগ্রাথিয়া, ভোগন, আর মহাবিশ্বের জটিলতা
গল্পে আরও আসে ম্যাগ্রাথিয়া, গ্যালাক্সির প্রেসিডেন্ট, যে আর্থার আর ফোর্ডকে উদ্ধার করে। ম্যাগ্রাথিয়া একজন ধূর্ত, মজার, আর সম্পূর্ণ অদক্ষ নেতা, যে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভাঙে, সোনার হার চুরি করে, আর মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য খুঁজতে বের হয়। তার সাথে আসে ট্রিলিয়ান, তার প্রেমিকা, আর মারভিন, একটি ডিপ্রেসড রোবট, যার বুদ্ধিমত্তা এত বেশি যে সে সবকিছু নিয়ে হতাশ।
মারভিন চরিত্রটি সিনেমার সবচেয়ে মজার অংশ। সে প্রতিটি কাজকে অর্থহীন মনে করে, প্রতিটি কথাকে বিরক্তিকর মনে করে, আর সব সময় হতাশায় ভুগে। শিক্ষার্থীদের জন্য মারভিন শেখায়—বুদ্ধিমত্তা সব সময় সুখ আনে না। বরং অনেক সময় বুদ্ধিমান মানুষরাই সবচেয়ে বেশি হতাশায় ভোগে।
'৪২': মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যের উত্তর
বইয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ হলো সেই রহস্য—জীবন, মহাবিশ্ব, আর সবকিছুর অর্থ কী? উত্তর হলো ৪২। কিন্তু সমস্যা হলো, কেউ জানে না ৪২ আসলে কী বোঝায়। একটি সুপার কম্পিউটার 'ডিপ থট' সাত মিলিয়ন বছর ধরে হিসাব করে এই উত্তর বের করে, কিন্তু প্রশ্নটা কী ছিল সেটা কেউ মনে রাখেনি।
এই অংশটি সায়েন্স ফিকশনের সবচেয়ে মজার এবং সবচেয়ে দার্শনিক মুহূর্ত। এটি দেখায়—উত্তর জানার চেয়ে প্রশ্ন জানা জরুরি। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় উত্তর মুখস্থ করে, কিন্তু প্রশ্নটা বুঝতে পারে না। এই বই শেখায়—প্রশ্ন করতে শেখা উত্তর জানার চেয়ে বড় শিক্ষা।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই বই জরুরি
'দ্য হিচহাইকারস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি শেখায়—জীবন গম্ভীর হতে পারে, কিন্তু হাসতে ভুলে যাওয়া যাবে না। এই বইটি সায়েন্স ফিকশনকে হাসির মাধ্যমে উপস্থাপন করে, যা পড়তে পড়তে শিক্ষার্থীরা মহাবিশ্ব, বিজ্ঞান, আর দর্শন সম্পর্কে শিখবে, কিন্তু এক মুহূর্তও বিরক্ত হবে না।
এই বই আরও শেখায়—জীবনে যাই ঘটুক, টাওয়েল সাথে রাখো। রূপক অর্থে, প্রস্তুত থাকো। আর্থার যখন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়, তখন সে প্রস্তুত ছিল না, কিন্তু ফোর্ড প্রস্তুত ছিল। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, জীবনে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটবেই, তাই প্রস্তুত থাকা জরুরি।
বইটি আরেকটি জরুরি শিক্ষা দেয়—মহাবিশ্ব বিশাল, কিন্তু মানুষ ছোট। আর্থার যখন মহাবিশ্বে ঘোরে, তখন সে বুঝতে পারে তার সমস্যা কতটা তুচ্ছ। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, নিজের সমস্যাকে অতিরিক্ত বড় করে দেখা উচিত না, কারণ মহাবিশ্বের দৃষ্টিতে সবকিছুই ছোট।
শেষ কথা
'দ্য হিচহাইকারস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি' শুধু একটি সায়েন্স ফিকশন বই নয়, এটি একটি কমেডি, একটি দর্শন, আর একটি জীবনদর্শন। এটি শেখায়—মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যের উত্তর হয়তো ৪২, কিন্তু আসল প্রশ্নটা খুঁজে বের করাই জীবনের উদ্দেশ্য। ছুটির দিনে বা পড়াশোনার ফাঁকে এই বইটা পড়লে শিক্ষার্থীরা হাসতে হাসতে মহাবিশ্ব সম্পর্কে শিখবে, আর জীবনের ছোট ছোট সমস্যাগুলোকে হালকাভাবে দেখতে শিখবে।
কারণ কিছু বই শুধু গল্প বলে, আর কিছু বই হাসতে হাসতে জীবন শেখায়। 'দ্য হিচহাইকারস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি' সেই ধরনের একটি বই, যা পড়ার পর মনে হয়—জীবন কঠিন, কিন্তু হাসতে ভুলে গেলে জীবন আরও কঠিন।
পূর্ববর্তী
উইলিয়াম গিবসনের 'নিউরোম্যান্সার' (১৯৮৪): সাইবারপাঙ্কের জন্মদাত্রী বই
পরবর্তীআইজ্যাক আসিমভের 'দ্য ফাউন্ডেশন ট্রিলজি' (১৯৫১): সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা মহাকাব্য
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
জল্লাদখানা বধ্যভূমি: মিরপুরের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের নির্মম ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: যে ইটের দেয়াল আজও বহন করে একাত্তরের শোক

খেলাধুলা ও বিনোদন
জাতীয় স্মৃতিসৌধ: সাত জোড়া দেয়ালে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
চন্দ্রাবতী মন্দির: কবির প্রেম, বিরহ আর মধ্যযুগের বাংলার এক নীরব স্মৃতিচিহ্ন
খেলাধুলা ও বিনোদন
বাঘা মসজিদ: রাজশাহীর মাটিতে সুলতানি বাংলার এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি

খেলাধুলা ও বিনোদন
পুঠিয়া রাজবাড়ি ও মন্দিরসমূহ: রাজশাহীর মাটিতে স্থাপত্য আর ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
