দেশে বিদেশে: ভ্রমণের আড়ালে মানুষ আর সংস্কৃতিকে আবিষ্কারের গল্প
বাংলা সাহিত্যের সেরা বইগুলো
Editorial Team৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৯:২৮ AM৪ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

ভ্রমণকাহিনি পড়তে গিয়ে আমরা সাধারণত নতুন কোনো দেশ, শহর, পাহাড়, নদী কিংবা স্থাপত্যের সঙ্গে পরিচিত হই। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ পড়লে বোঝা যায়, ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হয়তো কোনো জায়গা নয়—মানুষ।
বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় এই বইয়ে লেখক তাঁর আফগানিস্তান ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যেখানে ভ্রমণের সঙ্গে মিশে গেছে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং অসাধারণ রসবোধ। ফলে ‘দেশে বিদেশে’ শুধু একটি বিদেশ ভ্রমণের কাহিনি হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি ভিন্ন সমাজকে কাছ থেকে দেখার সাহিত্যিক জানালা।
আফগানিস্তানের পথে এক বাঙালি ভ্রমণকারী
সৈয়দ মুজতবা আলী জীবনের একটি পর্যায়ে আফগানিস্তানে শিক্ষকতা করতে গিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাই ‘দেশে বিদেশে’র অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
আজকের দিনে কোনো অপরিচিত দেশে যাওয়ার আগে মানচিত্র, ভিডিও, ছবি ও অসংখ্য তথ্য হাতের কাছে পাওয়া যায়। কিন্তু মুজতবা আলীর সময় ভিন্ন দেশ সম্পর্কে সাধারণ পাঠকের প্রত্যক্ষ ধারণা এত সহজলভ্য ছিল না।
তাই তাঁর চোখ দিয়ে আফগানিস্তানকে দেখা ছিল এক ধরনের সাহিত্যিক অভিযান।
তবে লেখক শুধু জায়গার বর্ণনা দেননি। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, তাদের আচরণ দেখেছেন, ভাষা শুনেছেন, সংস্কৃতির পার্থক্য বুঝেছেন এবং নিজের বাঙালি পরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে নতুন সমাজকে বোঝার চেষ্টা করেছেন।
এই ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিই বইটিকে আলাদা করে তোলে।
বিদেশ মানেই অপরিচিত নয়
‘দেশে বিদেশে’র একটি বড় সৌন্দর্য হলো—লেখক বিদেশকে একেবারে দূরের বা অচেনা পৃথিবী হিসেবে দেখান না।
আফগান সমাজের মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় যত গভীর হয়, ততই দেখা যায় মানুষের মৌলিক অনুভূতিগুলোর মধ্যে কত মিল। আতিথেয়তা, বন্ধুত্ব, কৌতূহল, রাগ, হাসি, অহংকার কিংবা আবেগ—সংস্কৃতি আলাদা হলেও মানুষের অনেক অনুভূতি একই রকম।
এখানেই ভ্রমণসাহিত্যটি একটি বৃহত্তর মানবিক মাত্রা পায়।
অন্য সংস্কৃতিকে শুধু ‘অন্য’ হিসেবে দেখার পরিবর্তে লেখক তার ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছেন। ফলে পাঠকও একটি অপরিচিত সমাজকে দূর থেকে দেখেন না; বরং তার মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
মুজতবা আলীর সবচেয়ে বড় শক্তি—রসবোধ
‘দেশে বিদেশে’ পড়ার সময় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি পাঠককে টেনে রাখে, তা হলো লেখকের **রসবোধ**।
মুজতবা আলী খুব সাধারণ একটি ঘটনাকেও এমনভাবে বলতে পারেন যে তার মধ্যে হাস্যরস তৈরি হয়। তাঁর রসিকতা কখনো পরিস্থিতিনির্ভর, কখনো চরিত্রনির্ভর, আবার কখনো নিজের অভিজ্ঞতাকেও তিনি হাস্যরসের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
তবে এই হাসি কখনো শুধু হাসানোর জন্য নয়।
রসিকতার আড়ালে তিনি মানুষকে দেখেন, সমাজকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংস্কৃতির পার্থক্যকে তুলে ধরেন। ফলে পাঠক একদিকে আনন্দ পান, অন্যদিকে অজান্তেই একটি নতুন সমাজ সম্পর্কে অনেক কিছু শিখে ফেলেন।
ভাষার ভেতরেই আরেক পৃথিবী
সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন বহু ভাষায় পারদর্শী। তাঁর লেখায় ভাষা তাই শুধু যোগাযোগের বিষয় নয়; ভাষা হয়ে ওঠে সংস্কৃতি বোঝার একটি দরজা।
‘দেশে বিদেশে’তে বিভিন্ন ভাষা, শব্দ, নাম ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির উপস্থিতি বইটির জগতকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
একজন ভ্রমণকারী যখন নতুন দেশে যান, তখন শুধু নতুন দৃশ্যই দেখেন না—নতুন শব্দও শোনেন। মানুষের কথা বলার ধরন, সম্বোধন, রসিকতা, অভ্যাস—এসবের মধ্যেও একটি সমাজের পরিচয় লুকিয়ে থাকে।
মুজতবা আলী সেই ভাষাগত বৈচিত্র্যকে তাঁর লেখায় এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে পাঠকের কাছে আফগানিস্তানের পরিবেশ আরও বাস্তব হয়ে ওঠে।
ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সম্পর্ক
‘দেশে বিদেশে’ শুধু ব্যক্তিগত ভ্রমণের স্মৃতিকথা নয়। বইটির মধ্যে আফগানিস্তানের সমাজ ও ইতিহাস সম্পর্কেও নানা পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
লেখক তাঁর সময়ের আফগান সমাজকে দেখেছেন একজন শিক্ষিত বাঙালি পর্যবেক্ষকের চোখে। ফলে সেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি পাওয়া যায় সমাজের রীতিনীতি, মানুষের জীবনযাপন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের নানা ছবি।
তবে বইটির সৌন্দর্য এখানেই যে এসব তথ্য আলাদা করে ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ের মতো পরিবেশন করা হয়নি। বরং মানুষের গল্প, কথোপকথন ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই একটি দেশের ছবি ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে।
বন্ধুত্বের গল্পও বটে
‘দেশে বিদেশে’র মানুষগুলো বইটির প্রাণ।
ভ্রমণের পথে লেখকের যেসব মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, তাদের কেউ খুব কাছের হয়ে ওঠেন, কেউ হাসির জন্ম দেন, কেউ বিস্মিত করেন, আবার কেউ পাঠককে একটি ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
এই মানুষগুলোর উপস্থিতির কারণে বইটি কেবল ‘আমি কোথায় গেলাম, কী দেখলাম’ ধরনের ভ্রমণবৃত্তান্ত হয়ে ওঠেনি।
বরং এখানে ভ্রমণ মানে **মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা**।
এ কারণেই বহু বছর পরেও বইটির চরিত্র ও মানুষের কথোপকথন পাঠকের মনে থেকে যায়।
নিজের দেশকে নতুন করে দেখা
বিদেশে গেলে মানুষ অনেক সময় নিজের দেশকেও নতুনভাবে দেখতে শেখে। ‘দেশে বিদেশে’র ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্য সংস্কৃতির মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক রীতি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস কিংবা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক দেখতে গিয়ে লেখকের নিজের বাঙালি পরিচয়ও বারবার সামনে আসে।
ফলে ‘দেশে বিদেশে’ শুধু আফগানিস্তানকে জানার বই নয়; এটি **নিজেকে এবং নিজের সংস্কৃতিকেও অন্যের চোখে নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি করে।**
এই কারণেই বইটির নামও যেন যথার্থ—‘দেশে’ এবং ‘বিদেশে’র মধ্যে একটি মানসিক সেতু তৈরি হয়।
কেন ‘দেশে বিদেশে’ পড়া উচিত?
‘দেশে বিদেশে’ পড়ার জন্য শুধু ভ্রমণকাহিনি পছন্দ করলেই হবে না। ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, মানুষ কিংবা সাহিত্য—যেকোনো একটি বিষয়েও আগ্রহ থাকলে বইটি পাঠককে আকর্ষণ করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, এটি শেখায় **কীভাবে একজন ভ্রমণকারী অন্য সংস্কৃতিকে দেখতে পারেন**। অপরিচিত মানুষকে শুধু বিচিত্র বা অদ্ভুত হিসেবে না দেখে তাদের জীবন, চিন্তা ও সংস্কৃতির ভেতরের যুক্তিকে বোঝার চেষ্টা করা—মুজতবা আলীর লেখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আর তাঁর রসবোধ বইটিকে কখনো ভারী হতে দেয় না।
বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণকাহিনির যে আলাদা একটি সৌন্দর্য ও সাহিত্যিক মর্যাদা রয়েছে, ‘দেশে বিদেশে’ তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ। বইটি পড়তে পড়তে পাঠক যেমন আফগানিস্তানের পথে হাঁটেন, তেমনি পরিচিত হন এক অসাধারণ পর্যবেক্ষক লেখকের সঙ্গে।
শেষ পর্যন্ত ‘দেশে বিদেশে’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—**পৃথিবীকে জানতে হলে শুধু জায়গা দেখতে হয় না, মানুষকে দেখতে হয়।**
আর সেই মানুষকে দেখার জন্য সৈয়দ মুজতবা আলীর চোখের মতো রসিক, কৌতূহলী এবং মানবিক একটি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি পাওয়া যায় না।
পূর্ববর্তী
মাচু পিচু: মেঘের ওপরে হারিয়ে যাওয়া ইনকাদের শহর
পরবর্তীকবর: অন্ধকারের ভেতর থেকে উঠে আসা একুশের প্রতিবাদের কণ্ঠ
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
জল্লাদখানা বধ্যভূমি: মিরপুরের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের নির্মম ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: যে ইটের দেয়াল আজও বহন করে একাত্তরের শোক

খেলাধুলা ও বিনোদন
জাতীয় স্মৃতিসৌধ: সাত জোড়া দেয়ালে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
চন্দ্রাবতী মন্দির: কবির প্রেম, বিরহ আর মধ্যযুগের বাংলার এক নীরব স্মৃতিচিহ্ন
খেলাধুলা ও বিনোদন
বাঘা মসজিদ: রাজশাহীর মাটিতে সুলতানি বাংলার এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি

খেলাধুলা ও বিনোদন
পুঠিয়া রাজবাড়ি ও মন্দিরসমূহ: রাজশাহীর মাটিতে স্থাপত্য আর ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
