এবার আসা যাক সেই বিজ্ঞানীর কথায়, তাঁর আবিষ্কারগুলো ছিল এতটাই যুগান্তকারী যে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীরাও তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তিনি দেবেন্দ্রমোহন বসু (ডি. এম. বসু) —বাংলার পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি মহাজাগতিক রশ্মি (Cosmic Rays) ও পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের (Nuclear Physics) জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলে উঠেছিলেন।
শিকড়: বিজ্ঞানের উত্তরাধিকার
১৮৮৫ সালের ২৬শে নভেম্বর কলকাতার এক শিক্ষিত ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন দেবেন্দ্রমোহন। তাঁর মাতুল ছিলেন স্বয়ং আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু—ভারতীয় বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনকারী সেই কিংবদন্তি পদার্থবিজ্ঞানী। বাবার অকালমৃত্যুর পর তাঁর শিক্ষার দায়িত্ব নেন এই মামা। প্রথমে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরিকল্পনা ছিল; কিন্তু মারাত্মক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সেই পথ বদলে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি জগদীশ বসুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, তাঁকে পদার্থবিজ্ঞানের পথে এগিয়ে যেতে পরামর্শ দেন।
১৯০৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন—প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে। তারপর এক বছর জগদীশ বসুর সঙ্গে গবেষণা করেন, উদ্ভিদের জৈবপদার্থবিদ্যা নিয়ে কাজ করেন
ইউরোপে শিক্ষা ও গবেষণা: যে অভিজ্ঞতা বদলে দিল জীবন
১৯০৭ সালে তিনি কেমব্রিজের ক্রাইস্টস কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে জে. জে. থমসন ও সি. টি. আর. উইলসন-এর মতো কিংবদন্তি পদার্থবিদদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। ১৯১২ সালে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব সায়েন্স থেকে পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯১৪ সালে তিনি বার্লিনের হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে যান অধ্যাপক এরিখ রেগেনারের ল্যাবে কাজ করতে। সেখানে তিনি উইলসন ক্লাউড চেম্বারের একটি নতুন সংস্করণ তৈরিতে যুক্ত হন এবং দ্রুতগতির আলফা কণার পথ অনুসরণ করে রিকোয়েল প্রোটনের ট্র্যাক ফটোগ্রাফ করতে সক্ষম হন—যা তখন ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং কাজ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে তাঁর জার্মানিতে অবস্থান পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ে, এবং ১৯১৯ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে ভারতে ফিরে আসেন।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক: স্বাধীন ভারতের বিজ্ঞানের স্থপতি
১৯১৯ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসবিহারী ঘোষ অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৩২ সালে তিনি সি. ভি. রমন-এর স্থলাভিষিক্ত হয়ে পালিত অধ্যাপক হন। ভারতের আর এক পদার্থবিদ মেঘনাদ সাহার সঙ্গে তিনিই ছিলেন ১৯২৭ সালে ইতালির কোমোতে অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান সম্মেলনে আমন্ত্রিত দুই ভারতীয় বিজ্ঞানী—যেখানে ১১ জন নোবেল বিজয়ী উপস্থিত ছিলেন।
সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তখন ভারতে দুর্লভ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের দুটি বই—Thermodynamik ও Warmestrahlung—দেবেন্দ্রমোহন তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। এই বইগুলিই সত্যেন্দ্রনাথকে প্ল্যাঙ্কের অনুকল্পে আগ্রহী করে তোলে, যা ১৯২৫ সালে বিখ্যাত "বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান"-এর ভিত্তি স্থাপন করে।
১৯৩৮ সালে মামা জগদীশ চন্দ্র বসুর মৃত্যুর পর তিনি বসু ইনস্টিটিউটের পরিচালক হন—এবং ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানের একটি বহুশাখা গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয়।
মহাজাগতিক রশ্মি ও নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানে যুগান্তকারী অবদান
মেসন কণার সন্ধানে: ডার্জিলিং-সান্ধাকফু অভিযান
১৯৩৯ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে দেবেন্দ্রমোহন বসু তাঁর সহকর্মী বিভা চৌধুরী-র সঙ্গে ডার্জিলিং-সান্ধাকফু অঞ্চলে মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা করেন। তারা ফটোগ্রাফিক ইমালশন পদ্ধতি ব্যবহার করে কসমিক রশ্মির ট্র্যাক ধারণ করেন এবং মিউ-মেসন (এক ধরনের সাবঅ্যাটমিক কণা) শনাক্ত করতে সক্ষম হন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো, নোবেল বিজয়ী সি. এফ. পাওয়েল পরে স্বীকার করেছেন যে মেসন গবেষণায় বসুর দল ছিল অগ্রগামী। পাওয়েলের দল পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে পাই-মেসন আবিষ্কার করে, কিন্তু বসুর কাজ ছিল অনেক আগের।
পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানে অবদান
কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা ও নিউট্রন পদার্থবিজ্ঞান: তিনি কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা (Artificial Radioactivity) ও নিউট্রন পদার্থবিজ্ঞান-এ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন।
ভারতে প্রথম: বসু ইনস্টিটিউটেই ভারতে প্রথম উইলসন ক্লাউড চেম্বার ও ককক্রফট-ওয়ালটন নিউট্রন জেনারেটর তৈরি করা হয়।
পরমাণু গবেষণা কমিটি: তিনি সিএসআইআরের পারমাণবিক গবেষণা কমিটির মাধ্যমে ভারতের উদীয়মান পারমাণবিক গবেষণা কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
স্বীকৃতি ও স্মৃতি
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে তাদের সর্বোচ্চ সম্মান 'দেশিকোত্তম' উপাধিতে ভূষিত করে।
তিনি বিজ্ঞান-অধ্যাত্মতার সম্পর্ক নিয়ে দার্শনিক চিন্তাও করতেন এবং A Concise History of Science in India বইটি সম্পাদনা করেন। ১৯৭৫ সালের ২রা জুন ৮৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন।
শেষকথা: বিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
দেবেন্দ্রমোহন বসু কেবল একজন গবেষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী সংগঠক, একজন শিক্ষকের শিক্ষক, এবং ভারতীয় বিজ্ঞানের ভিত্তি শক্তিশালী করার এক নিরলস কর্মী। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো মেধাবীকে তিনি শুধু বই দিয়ে উৎসাহিতই করেননি, নিজের প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন যেখানে পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা গবেষণার সুযোগ পাবেন।
তাঁর হাতে তৈরি উইলসন ক্লাউড চেম্বার, তাঁর আবিষ্কৃত মেসনের ট্র্যাক, তাঁর প্রতিষ্ঠিত গবেষণা পরিকাঠামো—সব মিলিয়ে তিনি ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি থাকবেন সেই মানুষের হিসেবে, যিনি মহাকাশ থেকে আসা অদৃশ্য কণাদের খুঁজে বের করেছিলেন, আর আমাদের দেখিয়েছিলেন পদার্থের ক্ষুদ্রতম জগৎও কত বিস্ময়কর।