'দ্য পেপার চেজ' (১৯৭৩): একটি সিনেমা, যা আইন স্কুলের প্রথম বছরের গল্প বলে, কিন্তু প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভয় তুলে ধরে
Editorial Team২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:১৩ PM০ ভিউ৪ মিনিট পড়া
শেয়ার:

প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে এমন একজন শিক্ষক আসেন, যাকে দেখলে বুকে ভয় ঢুকে যায়। ক্লাসে ঢোকার আগে হাত কাঁপে, নাম ডাকার আগেই মনে হয় সব ভুলে যাব। নিজের ওপর সন্দেহ হয়—আমি আসলে এখানে পড়ার যোগ্য কি না? জেমস ব্রিজেস পরিচালিত 'দ্য পেপার চেজ' (১৯৭৩) ঠিক এই অনুভূতিটাই পর্দায় তুলে ধরে। সিনেমার ঘটনা ঘটে হার্ভার্ড ল স্কুলে, যেখানে প্রথম বর্ষের ছাত্র জেমস হার্ট ভর্তি হয়, আর তার সামনে আসেন কিংবদন্তি চুক্তি আইনের অধ্যাপক চার্লস কিংসফিল্ড, যিনি সক্রেটিক পদ্ধতিতে প্রশ্ন করে ছাত্রদের সবার সামনে অপমান করেন।
সিনেমাটি জন জে অসবর্নের উপন্যাস অবলম্বনে বানানো, আর অসবর্ন নিজেই হার্ভার্ড ল স্কুলের স্নাতক। তাই সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যে বাস্তবতার ছোঁয়া আছে। কিংসফিল্ড একটি প্রশ্ন দিয়েই একজন ছাত্রকে এমনভাবে থামিয়ে দেন যে সে কথা বলতেই পারে না। যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য এই দৃশ্য পরিচিত, যে কখনও কঠিন শিক্ষকের ক্লাসে বসেছে।
হার্টের সংকট: ভয় থেকে আসক্তি
হার্ট মিনেসোটা থেকে আসে, স্কলারশিপ নিয়ে হার্ভার্ডে ঢোকে, কিন্তু বুঝতে পারে সে একেবারেই প্রস্তুত না। প্রথম ক্লাসেই কিংসফিল্ড তাকে প্রশ্ন করেন, হার্ট আটকে যায়, সবার সামনে অপমানিত হয়। সেই মুহূর্ত থেকেই কিংসফিল্ড হার্টের মাথায় ঢুকে যান—সে শুধু পাস করতে চায় না, সে কিংসফিল্ডের স্বীকৃতি চায়।
হার্ট তার সহপাঠীদের তিন ভাগে ভাগ করে—যারা হাল ছেড়ে দিয়েছে, যারা এখনও লড়ছে কিন্তু নাম ডাকার ভয় পায়, আর যারা নিজে থেকে হাত তুলে উত্তর দেয়। সে দ্বিতীয় দল থেকে তৃতীয় দলে উঠতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে। এই উদ্বেগ প্রায় প্রতিটি ভালো ছাত্রেরই অনুভূত। সে একটি স্টাডি গ্রুপে যোগ দেয়, যেখানে ছয়জন সদস্যের প্রত্যেকের আলাদা সমস্যা—কেউ মাঝপথে ছেড়ে দেয়, কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করে, গ্রুপের ভেতরেও ঝগড়া লেগে থাকে। এই সিনেমা ল স্কুলকে রোমান্টিক করে না, এটি দেখায়—একজন মানুষ যখন চাপে পিষে যায়, তখন সে নিজেকে কীভাবে টুকরো টুকরো করে জোড়া লাগায়।
সুসান ফিল্ডস: একটি বিতর্কিত সম্পর্ক
হার্ট সুসান নামের একটি মেয়ের সাথে দেখা করে, আর তাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক শুরু হয়। এই সম্পর্কটি সিনেমার দুর্বল অংশ হিসেবে বিবেচিত, কেউ কেউ লিন্ডসে ওয়াগনারের অভিনয়কে "প্লাস্টিক" বলেছেন। কিন্তু সুসান চরিত্রটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে—হার্ট পরে জানতে পারে সুসান আসলে কিংসফিল্ডের মেয়ে, আর তার বাবা-মায়ের ডিভোর্সের পর তার মা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
এই সত্য হার্টের আচরণকে আরও বিকৃত করে তোলে। সে সুসানকে কিংসফিল্ডের কাছে পৌঁছানোর সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, এমনকি সুসানের বাবার বিছানায় তার সাথে সম্পর্ক করে—একটা প্রতিশোধ হিসেবে, একটা মানসিক জয় হিসেবে। একজন শিক্ষার্থী যখন শিক্ষকের স্বীকৃতির জন্য এতটা তাড়িত হয় যে তার নৈতিক বিবেক হারিয়ে যায়, সেটা আর অনুপ্রেরণার গল্প না, সেটা সতর্কবার্তা।
একটি অর্থহীন বিজয়
সিনেমার সবচেয়ে অস্বস্তিকর দৃশ্য হলো শেষটা। হার্ট ফাইনাল পরীক্ষা দেয়, রেজাল্ট আসে। সে খামটা খোলে না, বরং কাগজটা ভাঁজ করে কাগজের বিমান বানিয়ে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। অনেকেই এটাকে মুক্তির প্রতীক বলে ব্যাখ্যা করেন, কিন্তু আরও গভীরে দেখলে এটা আসলে পলায়ন। সে পুরো এক বছর কিংসফিল্ডের স্বীকৃতির পেছনে ছুটেছে, অথচ শেষে নিজের নম্বর কী হয়েছে সেটাও জানতে চায় না।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, হার্ট শেষে লিফটে কিংসফিল্ডকে সম্মান জানাতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিংসফিল্ড তার নামও মনে করতে পারেন না। এই ছোট্ট মুহূর্তটি নির্মমভাবে একটা সত্য প্রকাশ করে—শিক্ষার্থী ভাবে সে শিক্ষকের সাথে একটা "লড়াই" লড়ছে, কিন্তু শিক্ষক সেই লড়াইয়ের অস্তিত্বই জানেন না। হার্টের সারা বছরের মানসিক যুদ্ধ কিংসফিল্ডের কাছে অসংখ্য ছাত্রের মধ্যে একজন মাত্র।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই সিনেমা জরুরি
'দ্য পেপার চেজ' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি একটা সত্য দেখায় যা অনেক শিক্ষার্থী স্বীকার করতে চায় না—কিছু প্রতিযোগিতার কোনো শেষ নেই, কিছু স্বীকৃতি কখনও আসে না। একজন অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী এই সিনেমা নিয়ে লেখেন, সিনেমাটি "ল স্কুল অভিজ্ঞতার আসল essence ধরে রেখেছে—এটা একটা ঈর্ষাকাতর প্রেমিকা, প্রেম, খেলা, শখ, সাধারণ আনন্দ—সবকিছুই গৌণ হয়ে যায়।"
সিনেমাটির রেটিং আসলে খুব বেশি না, IMDb-তে মাত্র ৭.২, কিছু সমালোচক বলেন এটি "কখনও কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা মজার দিকে এগোয় না"। কিন্তু এটি দেখার যোগ্যতা এখানেই—এটি কোনো উত্তর দেয় না। হার্ট শেষে যা ছুঁড়ে ফেলে, সেটা শুধু রেজাল্ট শিট না, সেটা হলো সেই মনের অবস্থা—"কিংসফিল্ডের স্বীকৃতি ছাড়া আমার কোনো মূল্য নেই"। এই ছুঁড়ে ফেলা সফল হয় কি না, সিনেমা তা বলে না।
জন হাউসম্যান কিংসফিল্ড চরিত্রে অভিনয় করে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার অস্কার পান, আর তার সেই সংলাপ—"তুমি এখানে কী পড়াতে এসেছ?"—চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ক্লাসরুম প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে আছে।
শেষ কথা
'দ্য পেপার চেজ' শুধু একটি আইন স্কুলের সিনেমা নয়, এটি একটি মানসিক যুদ্ধের গল্প। এটি শেখায়—শিক্ষকের স্বীকৃতির পেছনে ছোটা ভালো, কিন্তু নিজের মূল্য নিজের কাছে না থাকলে সেই স্বীকৃতিও শূন্য। ছুটির দিনে বা পরীক্ষার চাপে যখন মনে হবে কেউ তোমাকে বুঝছে না, তখন এই সিনেমাটা দেখো। কারণ কিছু সিনেমা গল্প বলে, আর কিছু সিনেমা প্রশ্ন করে—'দ্য পেপার চেজ' সেই ধরনের একটি সিনেমা।
পূর্ববর্তী
ফ্যাক্টফুলনেস: যে বই আপনাকে দেখাবে বিশ্ব আসলে যতটা খারাপ মনে হয়, ততটা নয়
পরবর্তী'ডেজড অ্যান্ড কনফিউজড' (১৯৯৩) : একটি সিনেমা, যা একটি রাতের গল্প বলে, কিন্তু একটি প্রজন্মের অনুভূতি ধরে রাখে
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
'আ বিউটিফুল মাইন্ড' (২০০১): একটি সিনেমা, যা শেখায় মেধা আর মানসিক স্বাস্থ্য একসাথে চলে

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য এজ অব সেভেনটিন' (২০১৬) : একটি সিনেমা, যা শেখায় কিশোর বয়সের একাকীত্ব স্বাভাবিক

খেলাধুলা ও বিনোদন
'টয় স্টোরি ৩' (২০১০) : একটি অ্যানিমেশন, যা শেখায় বড় হওয়া মানে ছেড়ে দেওয়া

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য থিওরি অব এভরিথিং' (২০১৪) : একটি সিনেমা, যা শেখায় মেধা আর ভালোবাসা একসাথে চলে

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য ব্রেকফাস্ট ক্লাব' (১৯৮৫) : একটি সিনেমা, যা শেখায় কেউ আসলে স্টেরিওটাইপ নয়

খেলাধুলা ও বিনোদন
'স্ট্যান্ড বাই মি' (১৯৮৬) : একটি সিনেমা, যা শেখায় বারো বছর বয়সের বন্ধুত্বই জীবনের সেরা বন্ধুত্ব
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
