জামাল নজরুল ইসলাম: যে বাঙালি বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি নিয়ে ভাবতেন
জামাল নজরুল ইসলাম

মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে হয়েছিল—এই প্রশ্নটি নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে গবেষণা করছেন।
কিন্তু আরেকটি প্রশ্নও কম রহস্যময় নয়।
মহাবিশ্বের শেষ কী হবে?
একদিন কি সব নক্ষত্র নিভে যাবে?
কৃষ্ণগহ্বরগুলোর কী হবে?
মহাবিশ্ব কি চিরকাল প্রসারিত হতে থাকবে, নাকি কোনো এক সময় আবার সংকুচিত হয়ে পড়বে?
আর কোটি কোটি কোটি বছর পর এই বিশাল মহাবিশ্বের পরিণতিই বা কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের তাকাতে হয় মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঠামোর দিকে—নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, কৃষ্ণগহ্বর, স্থান, সময় এবং মহাকর্ষের দিকে।
আর এই বিশাল প্রশ্নগুলোর মধ্যে নিজের চিন্তার জগৎ তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশের একজন গণিতভিত্তিক পদার্থবিজ্ঞানী—জামাল নজরুল ইসলাম।
তিনি ছিলেন গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের মানুষ। তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল cosmology, general relativity, mathematical physics এবং black hole theory। তাঁর লেখা The Ultimate Fate of the Universe বইটি মহাবিশ্বের সুদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ পাঠকের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে ওঠে।
কিন্তু জামাল নজরুল ইসলামের গল্প শুধু মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বইয়ের গল্প নয়।
এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি বিশ্বের সেরা বৈজ্ঞানিক পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত নিজের দেশেই ফিরে এসেছিলেন।
ছোটবেলা থেকেই গণিতের প্রতি টান
১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ঝিনাইদহে জন্মগ্রহণ করেন জামাল নজরুল ইসলাম। তাঁর পারিবারিক শিকড় ছিল চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি অঞ্চলে। তাঁর বাবা খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম ব্রিটিশ ভারতের বিচার বিভাগে কর্মরত ছিলেন। বাবার চাকরির কারণে শৈশবের একটি সময় কলকাতাতেও কাটে তাঁর।
পড়াশোনার শুরুটা হয় চট্টগ্রামে।
তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাকিস্তানের মুরির Lawrence College-এ যান এবং Senior Cambridge ও Higher Senior Cambridge পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
এরপর তাঁর শিক্ষাজীবনের সামনে খুলে গেল আরও বড় একটি দরজা।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়।
কেমব্রিজে নতুন পৃথিবী
গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে কেমব্রিজের নাম আলাদা করে বলার প্রয়োজন হয় না।
নিউটন থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জড়িয়ে আছে।
জামাল নজরুল ইসলামও এই পরিবেশের অংশ হয়ে গেলেন।
১৯৫৯ সালে তিনি Cambridge University-তে Functional Mathematics ও Theoretical Physics-এ পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর তিনি Trinity College, Cambridge-এ Mathematical Tripos-এর সঙ্গে যুক্ত হন। পরে applied mathematics ও theoretical physics-এ PhD সম্পন্ন করেন এবং ১৯৮২ সালে DSc অর্জন করেন।
কিন্তু কেমব্রিজে পড়াশোনা শেষ করাই তাঁর লক্ষ্য ছিল না।
কারণ তাঁর সামনে তখন এমন কিছু প্রশ্ন ছিল, যেগুলোর উত্তর পৃথিবীর কোনো একটি ল্যাবরেটরিতে পাওয়া যাবে না।
সেসব প্রশ্নের আকার ছিল—
পুরো মহাবিশ্ব।
যখন গণিত দিয়ে মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা
মহাবিশ্বকে বোঝার জন্য শুধু দূরবীন দিয়ে তাকানো যথেষ্ট নয়।
কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সি কিংবা কৃষ্ণগহ্বরের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়।
তাই মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের আরেকটি শক্তিশালী হাতিয়ার রয়েছে—
গণিত।
আইনস্টাইনের General Theory of Relativity দেখিয়েছিল, মহাকর্ষকে শুধু কোনো অদৃশ্য আকর্ষণ বল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। ভর ও শক্তি স্থান-কালের কাঠামোকে প্রভাবিত করে এবং সেই কাঠামোর সঙ্গে মহাবিশ্বের গতিবিধির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এই তত্ত্বের গাণিতিক কাঠামো ব্যবহার করেই বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের প্রসারণ, নক্ষত্রের মৃত্যু, কৃষ্ণগহ্বর এবং মহাজাগতিক বিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন।
জামাল নজরুল ইসলাম এই জগতেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ গবেষক ছিলেন।
মহাবিশ্ব কি চিরকাল থাকবে?
এই প্রশ্নটি শুনতে দার্শনিক মনে হতে পারে।
কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে কঠিন পদার্থবিজ্ঞান।
মহাবিশ্ব বর্তমানে প্রসারিত হচ্ছে—এটি বিশ শতকের মহাজাগতিক বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। কিন্তু এই প্রসারণের ভবিষ্যৎ কী?
একটি সম্ভাবনা হলো মহাবিশ্ব অনন্তকাল প্রসারিত হতে পারে।
আরেকটি ঐতিহাসিক সম্ভাবনা ছিল—যদি মহাবিশ্বে পর্যাপ্ত পদার্থ ও মহাকর্ষীয় প্রভাব থাকে, তাহলে প্রসারণ ধীর হয়ে একসময় মহাবিশ্ব আবার সংকুচিত হতে পারে।
এই ধরনের প্রশ্ন নিয়ে তাত্ত্বিক মহাজাগতিক বিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে।
জামাল নজরুল ইসলামও মহাবিশ্বের এই দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তন নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেছেন।
যে বই মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎকে পাঠকের সামনে নিয়ে এল
প্রফুল্লচন্দ্র রায়: যে বিজ্ঞানী প্রমাণ করেছিলেন, গবেষণাগার থেকে একটি জাতির ভবিষ্যৎও তৈরি করা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: যে কবি বাংলা ভাষাকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বের দরবারে পূর্ববর্তী
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
