হাসান আজিজুল হক: ভাষার পরীক্ষানিরীক্ষা ও নিভৃতচারী সেই মহাকথাকার, যিনি ছোটগল্পকে আধুনিকতার অনন্য উচ্চাসনে বসিয়েছেন
হাসান আজিজুল হক
বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু লেখক আছেন যাঁরা কেবল লেখেন না, তাঁরা ভাষার সঙ্গে খেলেন, গল্পের প্রচলিত কাঠামো ভেঙে নতুন এক বিশ্ব সৃষ্টি করেন। হাসান আজিজুল হক ছিলেন তেমনই এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। যাঁকে অনেকে মনে করেন বাংলা ছোটগল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী । যাঁর কলমে যেমন ধরা পড়েছে উপমহাদেশীয় বিভাজনের যন্ত্রণা, তেমনি ফুটে উঠেছে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ও প্রতিশ্রুতির অবক্ষয়; তেমনি আবার তিনি সাহসের সঙ্গে তুলে এনেছেন প্রাণীজগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নৈতিক প্রশ্ন । তিনি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক, তবে তাঁর প্রকৃত পরিচয় তিনি একজন নিভৃতচারী, ভাষার পরীক্ষানিরীক্ষক ও আধুনিক গল্পকার ।
শৈশব ও শিক্ষা: পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজশাহী
১৯৩৯ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার জবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হাসান আজিজুল হক । ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ১৯৫৪ সালে তাঁর পরিবার পূর্ববঙ্গে—খুলনার কাছে ফুলতলায়—চলে আসে ।
ছেলেবেলা থেকেই তিনি সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতেন । তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৬০ সালে সেখান থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন । এরপরই তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং দীর্ঘকাল সেখানেই কর্মরত ছিলেন । বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী এই লেখকের কর্মজীবন কেটেছে শিক্ষকতায়, আর সেখান থেকেই তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি প্রবাহিত হয়েছে নিরন্তর।
গল্পকারের আত্মপ্রকাশ ও সাহিত্যকীর্তি
মাত্র ২১ বছর বয়সে—১৯৬০ সালে—একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘শকুন’ । প্রথম থেকেই তাঁর গল্প পাঠক ও সমালোচকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন, শীতের অরণ্য’ । এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এরপর ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় সংকলন ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ ।
তিনি সাহিত্যের প্রতিটি ধাপেই নতুন কিছু এনেছেন, বিশেষত গল্প বলার ভাষা ও শৈলীতে। বিশিষ্ট সমালোচকেরা তাঁর এই অসামান্য শৈল্পিক গুণের কথা স্বীকার করে বলেন: “হাসান আজিজুল হক তাঁর সমসাময়িকদের থেকে একেবারে আলাদা—কারণ তিনি যে বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আপাত অবাস্তবতায় আবৃত” ।
তাঁর গল্পের ভাষা যেমন সাহিত্যিক, তেমনি কাব্যময়। পাঠকেরা প্রথম থেকেই তাঁর গল্পের কাব্যিকতা লক্ষ্য করেছেন—যা তাঁকে অন্যান্য গল্পকারদের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে ।
উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ
উপন্যাস
গল্পের পাশাপাশি তিনি কয়েকটি উপন্যাসও রচনা করেছেন:
আত্মজীবনী
ফিরে যাই ফিরে আসি
উঁকি দিয়ে দিগন্ত
মুক্তিযুদ্ধ, উপনিবেশ ও প্রান্তিক মানুষের প্রতিচ্ছবি
হাসান আজিজুল হকের গল্পের উপজীব্য ছিল মূলত উপনিবেশিক ইতিহাস ও তার পরবর্তী পরিণতি—বিশেষত ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন ও ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ । তিনি তাঁর গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন—
পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্য সমালোচকদের মতে, তাঁর গল্পের মূল্যায়নে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রান্তিক মানুষের ওপর প্রভাব নিয়ে তাঁর অসামান্য চিত্রায়ন । তাঁর ‘নামহীন গোত্রহীন’ (১৯৭৪) সংকলনটি বিশেষভাবে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতাকে শৈল্পিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে ।
‘শকুন’ ও অন্যান্য গল্পে প্রাণী-মানুষের সম্পর্ক
সম্প্রতি হাসান আজিজুল হকের গল্পে প্রাণীজগতের উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়েছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে তাঁর ‘শকুন’ বা ‘আমৃত্যু আজীবন’-এর মতো গল্পে প্রাণীরা কেবল পটভূমি নয়, বরং তারা গল্পের অর্থবহ অংশীদার ।
এই গল্পগুলিতে শকুনের ঠোঁট বা সাপের কামড়—এই শারীরিক স্পর্শের মাধ্যমেই লেখক শোষিত মানুষের অসহায়ত্ব ও নৈতিক সংকটকে আরও গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । আধুনিক সাহিত্য সমালোচনা বলছে, এই প্রাণীচরিত্রগুলির মাধ্যমে তিনি তুলে এনেছেন বহুপ্রজাতিক নৈতিকতার এক নতুন প্রশ্ন—যা বাংলা সাহিত্যে বিরল ।
ভাষার পরীক্ষানিরীক্ষা ও স্বতন্ত্র শৈলী
হাসান আজিজুল হকের সবচেয়ে বড় অবদান হলো ছোটগল্পের ভাষায় এক নতুন মাত্রা যোগ করা। তিনি বাংলা গল্পে একটি নতুন গদ্যভাষা তৈরি করেছেন, যা অনেকটা কাব্যিক ও রূপকধর্মী ।
বিশ্লেষকদের মতে, “হাসান আজিজুল হক তাঁর প্রথম দিককার গল্পগুলিতেই এমন একটি অনন্য শৈলী অর্জন করেছিলেন যা বাংলা সাহিত্যে আগে কখনও দেখা যায়নি” । তাঁর ভাষার এই বৈশিষ্ট্য পাঠককে কখনও কখনও বিভ্রান্তও করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক অনন্য সাহিত্যানুভূতি দেয়।
পূর্ববর্তীএকাদশে ভর্তি শুরু হতে পারে ২ সেপ্টেম্বর: ২৫ লাখ আসনের দেশে লড়াই হবে পছন্দের কলেজের জন্য
পরবর্তী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: স্বপ্ন আর চিলেকোঠার সেই সৈনিক, যিনি দুই উপন্যাসেই বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি বদলে দিলেন
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
