নাইট আউলদের জন্য সতর্কবার্তা: কাজ-জীবনের ভারসাম্যহীনতা বাড়ায় মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি
ফিনল্যান্ডের ২,২৬৬ কর্মজীবী মানুষের ওপর করা এক বিস্তৃত গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ‘নাইট আউল’ বা রাতের মানুষ (evening-types), তারা দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সকালের মানুষের তুলনায় তিন গুণ পর্যন্ত বেশি। আর এই সম্পর্কের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে কাজ-জীবনের ভারসাম্যহীনতা—বিশেষ করে কাজের চাপ থেকে পর্যাপ্ত পুনরুদ্ধার করতে না পারা।
গবেষণাটি কীভাবে করা হয়েছে?
ইউনিভার্সিটি অফ ইস্টার্ন ফিনল্যান্ড-এর ড. ইলোনা মেরিকান্তো ও তাঁর সহকর্মীরা ফিনল্যান্ডের Healthy Finland Study-এর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এই গবেষণায় ২০ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মজীবী মানুষের ক্রোনোটাইপ (chronotype)—অর্থাৎ তারা ‘সকালের মানুষ’ নাকি ‘রাতের মানুষ’—চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি তারা পরিমাপ করেছেন:
বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা—মানসম্মত স্ক্রিনিং টুলের মাধ্যমে
মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার চিন্তা—স্ব-প্রতিবেদনের ভিত্তিতে
প্রকৃত চিকিৎসা গ্রহণ—ফিনল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্য রেজিস্টার থেকে সংগৃহীত তথ্য
এছাড়া তারা দুটি বিষয়ও যাচাই করেছেন:
১. কাজ কতটা ব্যক্তিগত জীবনে ‘ছড়িয়ে পড়ে’—অর্থাৎ, কাজের চিন্তা বা কাজের কাজ শেষ হওয়ার পরও তা মনের মধ্যে থেকে যায় কিনা।
২. কাজের চাপ থেকে কতটা ভালোভাবে পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়—অর্থাৎ, কাজ শেষে শারীরিক ও মানসিকভাবে রিচার্জ হওয়া যায় কিনা।
ফলাফল কী বলছে?
গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত স্পষ্ট:
যারা ‘definite evening-type’ বা পাকা রাতের মানুষ, তারা সকালের মানুষের তুলনায় বিষণ্নতা বা দুশ্চিন্তার জন্য চিকিৎসা নেওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
তারা মানসিক চাপ ও সাধারণ দুশ্চিন্তার স্ক্রিনিং-এ পজিটিভ হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।
আত্মহত্যার চিন্তা রিপোর্ট করার প্রবণতাও তাদের মধ্যে বেশি দেখা গেছে।
মাঝারি ধরণের রাতের মানুষদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে, যদিও তা কিছুটা কম তীব্র।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাতের মানুষরা কাজ-জীবনের ভারসাম্যহীনতায় বেশি ভোগেন। তারা কাজের চাপ থেকে পুনরুদ্ধার করতে বেশি সমস্যা অনুভব করেন এবং কাজ তাদের ব্যক্তিগত সময় ও মানসিক জায়গায় বেশি ঢুকে পড়ে।
গবেষকরা হিসাব করে দেখেছেন, দুর্বল পুনরুদ্ধার এই সম্পর্কের প্রায় ১৩% ব্যাখ্যা করে। অর্থাৎ, রাতের মানুষদের প্রাকৃতিক ছন্দ (natural rhythm) যখন প্রচলিত ৯-৫ কর্মঘণ্টার সঙ্গে মেলে না, তখন তারা কাজের চাপ বেশি অনুভব করেন এবং কাজ শেষে সেটা থেকে সরে আসতে পারেন না। যে কাজগুলো সকালে করতে অসুবিধা হয়, সেগুলো পরে ব্যক্তিগত সময়েও চলে আসে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
কেন এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ?
এটি প্রথম বড় আকারের গবেষণা যা দেখিয়েছে, কাজ-জীবনের ভারসাম্যহীনতা রাতের মানুষদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশেষ করে ফিনল্যান্ডের মতো দেশে, যেখানে কর্মঘণ্টা তুলনামূলকভাবে কম ও কাজের পরিবেশ ভালো, সেখানেও এই সমস্যা এত প্রকট—তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গবেষকরা বলছেন, রাতের মানুষরা মোট কর্মক্ষম বয়সী জনসংখ্যার প্রায় ১২% থেকে ২৪%। অর্থাৎ, প্রতি চার থেকে আট জন কর্মীর মধ্যে একজন রাতের মানুষ—যারা এই ঝুঁকির মুখে থাকতে পারেন।
কী করণীয়?
ড. মেরিকান্তো ও তাঁর দল মনে করছেন, কর্মক্ষেত্রে কাজ-জীবনের ভারসাম্য-সংক্রান্ত নীতিগুলো রাতের মানুষদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন:
নমনীয় কর্মঘণ্টা—যাতে রাতের মানুষরা তাদের প্রাকৃতিক ছন্দ অনুযায়ী কাজ করতে পারেন।
পুনরুদ্ধারের সুযোগ—কাজের মাঝে পর্যাপ্ত বিরতি, কাজ শেষে ডিজিটাল ডিটক্স, বা মানসিক অবসরের জায়গা তৈরি করা।
সচেতনতা বাড়ানো—কর্মকর্তা ও সহকর্মীদের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা, যাতে রাতের মানুষরা নিজেদের ‘অলস’ বা ‘অনুৎপাদনশীল’ মনে না করেন।
ড. মেরিকান্তোর ভাষায়, “কাজ-জীবনের ভারসাম্য ও কাজ থেকে পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাগুলো সঠিক মানুষদের জন্যই লক্ষ্য করতে হবে। এতে কাজের জায়গায় সুস্থতা বাড়বে এবং বৈষম্যও কমবে।”
শেষ কথা
রাতের মানুষ হওয়া কোনো ‘অসুখ’ নয়—এটা একটি জৈবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু যখন সেই বৈশিষ্ট্যকে সমাজের প্রচলিত ৯-৫ কর্মঘণ্টার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয়, তখন তা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। এই গবেষণা দেখিয়েছে, সেই চাপ কমাতে কাজ-জীবনের ভারসাম্য ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কর্পোরেট ও নীতি-নির্ধারকদের এই বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যাতে রাতের মানুষরাও কাজের জায়গায় সুস্থ ও সফল থাকতে পারেন।
গবেষণাটি Sleep Health জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
কম্পোস্টেবল’ কফি কাপে প্লাস্টিকের পরিমাণ আরও বেশি!
পরবর্তীবুধের খোলসের নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে ধাতু
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
আইনস্টাইনের সমস্যার পেছনের আকৃতিতে মিললো নতুন বিস্ময়কর পদার্থবিজ্ঞান

বিজ্ঞান বার্তা
১২৫ মিলিয়ন বছরের পুরোনো কুমিরের ফসিলে UV আলোতে মিললো সম্ভাব্য ক্যামোফ্লেজ

বিজ্ঞান বার্তা
ক্ষুদ্র কোষীয় "অ্যান্টেনা" ব্যাখ্যা করতে পারে কেন কিছু শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মায়
বিজ্ঞান বার্তা
'স্টমাক বাগ' প্রতিরোধী কোষকে অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে পাঠায়
বিজ্ঞান বার্তা
'সময় গতি বাড়াচ্ছিল, কমাচ্ছিল, এমনকি থেমেও যাচ্ছিল': পদার্থবিদ ল্যাবে 'মিনি-ইউনিভার্স' তৈরি করে সময়ের একটি মূল তত্ত্ব প্রমাণ করলেন
বিজ্ঞান বার্তা
নাসা ISS-এ পদার্থের পঞ্চম অবস্থা তৈরি করছে, মিনি-ফ্রিজ আকারের quantum ল্যাবের আপগ্রেডের সুবাদে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
