যখন টেবলেট ও ক্রোমবুক কম্পিউটারের ধারণাই বদলে দিল: পিসির নতুন যুগ
iPads and Chromebooks (Most Important Tech Trends of the Decade)

কল্পনা করুন—২০১০ সালের জানুয়ারি। স্টিভ জবস মঞ্চে দাঁড়িয়ে একটি ডিভাইস হাতে তুলে নিলেন, যা দেখতে অনেকটা বড় আইফোনের মতো। সমালোচকরা হাসলেন। অনেকে বললেন, “এটা তো শুধু একটি বড় আইপড টাচ!” কেউ কেউ প্রশ্ন তুললেন, “এটাকে কি আদৌ কম্পিউটার বলা চলে?” কিন্তু ভোক্তারা অন্য সিদ্ধান্ত নিলেন। আর তার পরের দশকে, আইপ্যাড, ক্রোমবুক এবং অন্যান্য ট্যাবলেট-ভিত্তিক ডিভাইসগুলি কম্পিউটারের সংজ্ঞাই পাল্টে দিল। আমরা আজ যে ‘পিসি’ বলি, তা আর ১৯৮০-র দশকের ডেস্কটপ বা ২০০০-এর দশকের ল্যাপটপ নয়—বরং তা এক বহুমুখী, স্পর্শ-সংবেদনশীল, সর্বত্র বহনযোগ্য ডিভাইস, যা আমাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে গেছে।
২০১০: আইপ্যাডের আগমন এবং সন্দেহের জগৎ
২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি, স্টিভ জবস আইপ্যাড উন্মোচন করলেন। তিনি বলেছিলেন, এটি হবে “একটি সম্পূর্ণ নতুন শ্রেণির ডিভাইস, যা ব্যবহারকারীদের তাদের অ্যাপ ও কন্টেন্টের সঙ্গে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ, স্বজ্ঞাত ও আনন্দদায়কভাবে সংযুক্ত করবে।” কিন্তু প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা তখন সন্দিহান ছিলেন। সিএনইটি-র মতো সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন তুলেছিল, “আইপ্যাড কি সত্যিই একটি কম্পিউটার?” অনেকের মতে, এটি শুধু একটি বড় আইফোন, যা আসলে কোনো কাজের নয়—কারণ এতে কীবোর্ড নেই, মাউস নেই, ফাইল সিস্টেম নেই, এবং ‘রিয়েল’ সফটওয়্যার চালানোর ক্ষমতা নেই।
কিন্তু জবসের দূরদর্শিতা ছিল অন্যরকম। তিনি জানতেন, কম্পিউটিং-এর ভবিষ্যৎ আর ডেস্কে বাঁধা থাকবে না; তা হবে হাতে, সোফায়, বিছানায়, রান্নাঘরে—সর্বত্র। আর সেই স্বপ্ন সত্যি করতে গেলে দরকার ছিল একটি ডিভাইস, যা কখনোই ‘পিসি’ ছিল না, কিন্তু যা ‘কম্পিউটার’ হয়ে উঠতে পারে—যদি ব্যবহারকারীরা তাকে সেভাবে গ্রহণ করে।
আইপ্যাড: প্রথম কয়েক বছর
প্রথম আইপ্যাড ব্যাপকভাবে বিক্রি হয়েছিল, কিন্তু অনেকেই এটিকে শখের ডিভাইস হিসেবে দেখেছিলেন—ওয়েব ব্রাউজিং, ভিডিও দেখা, ই-বুক পড়ার জন্য একটি চমৎকার ট্যাবলেট, কিন্তু ‘প্রকৃত কাজের’ জন্য নয়। কিন্তু আইপ্যাড ২, যা ২০১১ সালের মার্চে এসেছিল, তা গেম-চেঞ্জার হিসেবে প্রমাণিত হয়। এটি ছিল পাতলা, দ্রুত, এবং এতে সামনে ও পেছনে দুটো ক্যামেরা ছিল—যা ফেসটাইম ভিডিও কলের জন্য দারুণ ছিল।
আইপ্যাড ২-এর সঙ্গে অ্যাপ স্টোরও পরিপক্ব হতে শুরু করে। বিশেষ করে আইওএস-এর জন্য ডিজাইন করা অ্যাপ—যেমন গ্যারেজব্যান্ড, আইমুভি, পেইজ, নম্বরস—প্রমাণ করতে শুরু করে যে ট্যাবলেটে সৃজনশীল কাজ ও ডকুমেন্ট তৈরি সম্ভব। শিশুদের শিক্ষা, ডিজিটাল আর্ট, মিউজিক প্রোডাকশন—এসব ক্ষেত্রে আইপ্যাড এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
তবুও, অনেক ‘পাওয়ার ইউজার’ (যাদের জন্য প্রোগ্রামিং, ভারী ডেটা বিশ্লেষণ, বা ভিডিও এডিটিং প্রয়োজন) আইপ্যাডকে ‘রিয়েল কম্পিউটার’ হিসেবে নিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু বাজার আরেকটি পথ দেখাল।
ক্রোমবুকের উত্থান: গুগলের নতুন দর্শন
ঠিক যখন আইপ্যাড পিসির ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছিল, তখন গুগল আরেকটি অস্ত্র নিয়ে আসে—ক্রোমবুক। ২০১১ সালে প্রথম ক্রোমবুক আসে, কিন্তু সেটি খুব বেশি সফল হয়নি। কারণ তখনকার ক্রোমবুক ছিল মূলত একটি ব্রাউজার-মাত্র—অফলাইনে কাজ করার ক্ষমতা খুব সীমিত, এবং সফটওয়্যার ইকোসিস্টেম ছিল দুর্বল।
কিন্তু ২০১৩-১৪ সালের মধ্যে ক্রোমবুকগুলি উন্নত হয়। অফলাইন মোড, অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ সাপোর্ট (২০১৬ থেকে), এবং ক্লাউড-ভিত্তিক কাজের ওপর জোর—এসব ক্রোমবুককে শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে স্কুল ও কলেজগুলিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে। কারণ:
ক্রোমবুক ছিল সস্তা (প্রায় $২০০-৩০০)।
এগুলো হালকা ও ব্যাটারি-দক্ষ ছিল—১২ ঘন্টা পর্যন্ত চলত।
সবকিছু ক্লাউডে সংরক্ষিত থাকায়, ডিভাইস হারিয়ে গেলেও ডেটা হারাত না।
সহজ ম্যানেজমেন্ট—শিক্ষক বা আইটি অ্যাডমিন এক ক্লিকে শত শত ক্রোমবুক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
আজ মার্কিন স্কুলগুলিতে ক্রোমবুকের占有率 ৫০%-এর বেশি। আর মহামারি-পরবর্তী সময়ে ক্রোমবুক ঘরে বসে কাজ ও পড়াশোনার জন্য অন্যতম পছন্দের ডিভাইস হয়ে উঠেছে।
স্মার্টফোন: বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র কম্পিউটার
শুধু ট্যাবলেট ও ক্রোমবুক নয়, আরেকটি শ্রেণির ডিভাইস কম্পিউটারের ধারণাকে বদলে দিয়েছে—স্মার্টফোন। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক মানুষের কাছে স্মার্টফোনই প্রথম ও একমাত্র কম্পিউটার। তারা কখনো ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ ব্যবহার করেননি, কিন্তু তাদের ফোন দিয়ে তারা ব্যাংকিং করেন, শিখেন, যোগাযোগ করেন, ব্যবসা করেন, এমনকি ভিডিও এডিটও করেন।
বাংলাদেশ, ভারত, আফ্রিকার অনেক দেশে—যেখানে ডেস্কটপ পিসি কখনো সবার কাছে পৌঁছায়নি—সেখানে স্মার্টফোন ডিজিটাল বিপ্লব এনে দিয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, পে-টিএম), অনলাইন শিক্ষা, টেলিমেডিসিন—এসব সম্ভব হয়েছে হাতের মুঠোয় থাকা এই ‘কম্পিউটার’-এর কারণে।
পিসির রূপান্তর: যখন ডেস্কটপ নিজেই মোবাইল হয়ে গেল
মজার ব্যাপার হলো, ট্যাবলেট ও স্মার্টফোন যেমন কম্পিউটারের সংজ্ঞা বদলিয়েছে, তেমনি সেগুলো ঐতিহ্যবাহী পিসিকেও বদলে দিয়েছে। উইন্ডোজ ৮ (২০১২) ছিল মাইক্রোসফটের প্রথম অপারেটিং সিস্টেম, যা টাচ-ইন্টারফেসকে কেন্দ্র করে ডিজাইন করা হয়েছিল। যদিও সেটি ব্যর্থ হয়েছিল, উইন্ডোজ ১০ ও ১১ তে টাচ, পেন, ভয়েস—সবই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আজকের ল্যাপটপগুলিতে টাচস্ক্রিন, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর, ফেস আনলক, এমনকি সিম কার্ড স্লটও থাকে। মাইক্রোসফটের সারফেস ডিভাইস, অ্যাপলের ম্যাকবুক—সবগুলিই এখন ট্যাবলেট এবং ল্যাপটপের মধ্যবর্তী কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে। কী-বোর্ড আর মাউসের পাশাপাশি স্পর্শ আর পেন এখনও গুরুত্বপূর্ণ ইনপুট মাধ্যম।
পিসি ‘মৃত্যু’ বনাম পিসি ‘রূপান্তর’
২০১০-এর দশকে বারবার শোনা গেছে—‘পিসির যুগ শেষ’, ‘ট্যাবলেট পিসি মেরে ফেলবে’ ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে, তা হলো পিসি শেষ হয়নি, বরং রূপান্তরিত হয়েছে।
পিসি আর শুধু ডেস্কে বাঁধা যন্ত্র নয়—এটি এখন সোফায়, বিছানায়, মিটিং রুমে, এমনকি বহির্ভবনে ব্যবহারযোগ্য।
পিসি এখন অ্যাপ-কেন্দ্রিক, ক্লাউড-চালিত, এবং মোবাইল-সদৃশ ইন্টারফেসের অধিকারী।
পিসি এখন শুধু ‘কাজের যন্ত্র’ নয়—এটি বিনোদন, শিক্ষা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ সালের মহামারির সময় পিসি বিক্রি বেড়েছিল প্রায় ১৫%, কারণ লকডাউনে মানুষ ঘরে বসে কাজ ও পড়াশোনার জন্য উন্নত ডিভাইস খুঁজেছিল। আর এই চাহিদা আজও থেমে নেই।
ভবিষ্যৎ: পিসির পরবর্তী বিবর্তন
আমরা এখন ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে। ট্যাবলেট, ক্রোমবুক, স্মার্টফোন—এই তিনটি শ্রেণির মধ্যে সীমারেখা আরও অস্পষ্ট হচ্ছে। অ্যাপলের নতুন আইপ্যাড প্রো এম-চিপসহ আসছে, যা অনেক ল্যাপটপের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। গুগল ক্রোমবুকগুলো এখন অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ও লিনাক্স অ্যাপও চালাতে পারে, যা তাদের প্রায় ‘পুরোপুরি’ পিসি-তে পরিণত করেছে। মাইক্রোসফটের সারফেস প্রো-র মতো ডিভাইসগুলো ট্যাবলেট ও ল্যাপটপের সেরাটা একত্রিত করছে।
ভবিষ্যতে আমরা হয়তো দেখব:
ফোল্ডেবল স্ক্রিন—যা ট্যাবলেট থেকে ল্যাপটপ, আবার স্মার্টফোনে রূপান্তরিত হতে পারে।
এআই-চালিত পিসি—যা ব্যবহারকারীর অভ্যাস শিখে নিজেই সেটিংস সামঞ্জস্য করবে।
ক্লাউড-প্রথম পিসি—যেখানে ডিভাইসটি কেবল একটি ‘উইন্ডো’ হবে, এবং সব হিসাব-নিকাশ হবে দূরবর্তী সার্ভারে (ক্লাউড কম্পিউটিং)।
শেষ কথা: ডিভাইস নয়, অভিজ্ঞতাই প্রধান
আইপ্যাড, ক্রোমবুক, স্মার্টফোন—এগুলোর প্রতিটি কিছু না কিছু ভাবে কম্পিউটারের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কম্পিউটার আর কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্র নয়—এটি একটি অভিজ্ঞতা। কম্পিউটার মানে এখন টাইপিং, ক্লিকিং, এবং ফাইল সংরক্ষণ নয়; এটি মানে সংযোগ, সৃজনশীলতা, এবং ক্ষমতায়ন।
স্টিভ জবস আইপ্যাডকে ‘ম্যাজিক্যাল’ বলেছিলেন। হয়তো তিনি সঠিক ছিলেন—কিন্তু এই যাদু শুধু আইপ্যাডে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ক্রোমবুক, স্মার্টফোন, এবং রূপান্তরিত পিসি—সবকিছুর মাধ্যমেই আমাদের জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে। আর ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে, এই যাত্রার পরবর্তী অধ্যায় লেখা হবে আমাদের হাতে থাকা ডিভাইসগুলো দিয়েই—যা আমরা ‘কম্পিউটার’ বলি বা না বলি, তারা আমাদের বিশ্বকে সংযুক্ত, সক্ষম, এবং আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
আইনস্টাইনের সমস্যার পেছনের আকৃতিতে মিললো নতুন বিস্ময়কর পদার্থবিজ্ঞান

বিজ্ঞান বার্তা
১২৫ মিলিয়ন বছরের পুরোনো কুমিরের ফসিলে UV আলোতে মিললো সম্ভাব্য ক্যামোফ্লেজ

বিজ্ঞান বার্তা
ক্ষুদ্র কোষীয় "অ্যান্টেনা" ব্যাখ্যা করতে পারে কেন কিছু শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মায়
বিজ্ঞান বার্তা
'স্টমাক বাগ' প্রতিরোধী কোষকে অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে পাঠায়
বিজ্ঞান বার্তা
'সময় গতি বাড়াচ্ছিল, কমাচ্ছিল, এমনকি থেমেও যাচ্ছিল': পদার্থবিদ ল্যাবে 'মিনি-ইউনিভার্স' তৈরি করে সময়ের একটি মূল তত্ত্ব প্রমাণ করলেন
বিজ্ঞান বার্তা
নাসা ISS-এ পদার্থের পঞ্চম অবস্থা তৈরি করছে, মিনি-ফ্রিজ আকারের quantum ল্যাবের আপগ্রেডের সুবাদে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
