যখন তার ছিঁড়ে গেল: অ্যাপল এয়ারপডস ও হেডফোন জ্যাকের অবসান
Airpods (Most Important Tech Trends of the Decade)
কল্পনা করুন—আপনার পকেট থেকে বের করলেন একটি ছোট সাদা কেস। খুললেন, কানে নিলেন দুটি ছোট ওয়্যারলেস ইয়ারবাড। সঙ্গীত বাজতে শুরু করল, আর আপনি স্বাধীন—কোনো তারের জট নেই, কোনো বাধা নেই। এটি আজকের সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু ২০১৬ সালে যখন অ্যাপল প্রথম এয়ারপডস চালু করেছিল, তখন এটি ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত ‘উদ্ভাবন’—কারণ অ্যাপল একইসঙ্গে আইফোন ৭ থেকে হেডফোন জ্যাক সরিয়ে দিয়েছিল। মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছিল, উপহাস করেছিল, এয়ারপডসকে ‘অদ্ভুত’ ও ‘বোকামি’ বলেছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে এয়ারপডস বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওয়্যারলেস ইয়ারবাড হয়ে উঠল, এবং পুরো স্মার্টফোন শিল্প অ্যাপলের পথ অনুসরণ করল। চলুন, এই বিপ্লবের গল্পটি শুনি।
২০১৬: সাহসী সিদ্ধান্ত বা বিতর্কিত পদক্ষেপ?
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর। অ্যাপলের তৎকালীন প্রধান বিপণন কর্মকর্তা ফিল শিলার মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, আইফোন ৭-এ আর হেডফোন জ্যাক থাকবে না। তার বদলে থাকবে একটি লাইটনিং (Lightning) পোর্ট, যা দিয়ে আপনি চার্জার বা ডিজিটাল অডিও অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করতে পারবেন। আর থাকবে অ্যাপলের নতুন এয়ারপডস—সম্পূর্ণ ওয়্যারলেস ইয়ারবাড, যার দাম $১৫৯।
শিলারের ভাষায়, এটি ছিল “সাহস” (Courage) —একটি পুরোনো, ১০০ বছর বয়সী অ্যানালগ প্রযুক্তি (হেডফোন জ্যাক) থেকে সরে এসে ডিজিটাল, ওয়্যারলেস ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা সহজে মেনে নেয়নি।
অনেকে বলল, “আমার হাজার টাকার হেডফোন এখন কাজ করবে না?”
অনেকে বলল, “এয়ারপডস দেখতে কেমন যেন দাঁত ব্রাশের মাথা!”
অনেকে বলল, “এত দামে তো ভালো ওয়্যারড হেডফোন পাওয়া যায়!”
এমনকি একটি অনলাইন পিটিশন স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যাতে অ্যাপলকে হেডফোন জ্যাক ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়।
অনেকে এটাকে অ্যাপলের লোভী কৌশল মনে করেছিলেন—যাতে মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল এয়ারপডস বা অ্যাডাপ্টার কিনে।
এয়ারপডস: প্রথম দর্শনে অদ্ভুত, কিন্তু অভিনব
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে যখন এয়ারপডস প্রথম বিক্রি হয়, তখন এর চাহিদা এতটাই কম ছিল যে অ্যাপল ডেলিভারি সময় বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু মজার ঘটনা ঘটতে শুরু করল:
সেটআপ ছিল জাদুকরী—আইফোনের কাছে এয়ারপডসের কেস খুললেই পপ-আপ আসত, এক ক্লিকে সংযোগ হয়ে যেত। এটি ছিল শিল্পের সবচেয়ে সহজ ওয়্যারলেস পেয়ারিং।
ব্যাটারি লাইফ—৫ ঘণ্টা প্লেব্যাক, আর কেসের ভেতরে মোট ২৪ ঘণ্টার চার্জ। দ্রুত চার্জের সুবিধাও ছিল।
অটো-পজ—কান থেকে একটি ইয়ারবাড খুলে ফেললে সঙ্গীত বন্ধ হয়ে যেত, আবার ঢুকালে শুরু হতো। এটি অভিনব ও ব্যবহারিক ছিল।
ডাবল-ট্যাপ—ইয়ারবাডে ডাবল ট্যাপ করলে সিরি সক্রিয় হতো বা সঙ্গীত পজ/প্লে হতো।
ওয়্যারলেস চার্জিং—পরবর্তী প্রজন্মে ওয়্যারলেস চার্জিং কেস আসে, যা আরও সুবিধাজনক।
এয়ারপডসের ডিজাইন নিয়ে প্রথম দিকে উপহাস ছিল, কিন্তু এটি এরগোনমিক (Ergonomic) ছিল—অধিকাংশ মানুষের কানে ভালোভাবে বসত, পড়ে যেত না, এবং হালকা ছিল।
কেন এয়ারপডস সফল হলো?
১. অ্যাপলের ইকোসিস্টেম
এয়ারপডস অ্যাপলের ইকোসিস্টেমের সঙ্গে অসাধারণভাবে কাজ করে। আপনি আইফোন, আইপ্যাড, ম্যাক—যেকোনো ডিভাইসের সঙ্গে সহজেই সংযোগ করতে পারেন। ডিভাইসগুলোর মধ্যে স্বয়ংক্রিয় স্যুইচিং (একটি ডিভাইস থেকে আরেকটিতে) আজও অনেক প্রতিযোগীর চেয়ে উন্নত।
২. কমফোর্ট ও ফিট
অধিকাংশ ইয়ারবাড কানে চেপে বসে, কিন্তু এয়ারপডস খোলা ডিজাইনের (Open-Ear) কারণে অনেকের কাছে আরামদায়ক। এটি দীর্ঘ সময় ব্যবহার করেও কানে ব্যথা হয় না।
৩. সাউন্ড কোয়ালিটি
প্রথম প্রজন্মের এয়ারপডসের শব্দ মান ‘ভালো’ ছিল, কিন্তু ‘অসাধারণ’ ছিল না। পরবর্তী প্রজন্মে (এয়ারপডস প্রো, এয়ারপডস প্রো ২) অ্যাপল অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন (ANC), স্বচ্ছতা মোড (Transparency Mode), এবং স্থানিক অডিও (Spatial Audio) যোগ করে, যা এটিকে অডিওফাইলদের জন্যও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
৪. অবস্থানের প্রতীক (Status Symbol)
এয়ারপডস একটি স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে উঠেছে—যেমন সাদা ইয়ারবাডগুলি একসময় আইপডের প্রতীক ছিল। সেলিব্রিটি, ক্রীড়াবিদ, এমনকি সাধারণ মানুষ—সবাই এয়ারপডস ব্যবহার করতে শুরু করল।
৫. ক্রমাগত উন্নতি
অ্যাপল প্রতি বছর এয়ারপডসের নতুন সংস্করণ চালু করছে—এয়ারপডস ২, এয়ারপডস প্রো, এয়ারপডস ম্যাক্স (ওভার-ইয়ার হেডফোন), এয়ারপডস ৩, এয়ারপডস প্রো ২। প্রতিটি সংস্করণে নতুন ফিচার ও উন্নতি।
হেডফোন জ্যাকের মৃত্যু: অ্যাপলের পথ অনুসরণ
অ্যাপল যখন হেডফোন জ্যাক সরিয়ে দেয়, তখন অনেক সমালোচক বলেছিল, এটি হবে ‘আইফোনের শেষ’। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল:
অন্যান্য স্মার্টফোন নির্মাতারা (গুগল, স্যামসাং, ওয়ানপ্লাস, এমনকি কিছু সময়ের জন্য) তাদের ফ্ল্যাগশিপ ফোন থেকে হেডফোন জ্যাক সরিয়ে দেয়।
ওয়্যারলেস ইয়ারবাডের বাজার দ্রুত বেড়ে যায়—সনি, স্যামসাং, বোস, জেব্রা, আনকার—সবাই তাদের নিজস্ব ওয়্যারলেস ইয়ারবাড চালু করে।
তবে কিছু নির্মাতা (যেমন এলজি, মটোরোলা, সনি) কিছু মডেলে হেডফোন জ্যাক রেখেছে, বিশেষ করে মিড-রেঞ্জ ফোনে, কারণ অনেক গ্রাহক এখনও ওয়্যারড হেডফোন পছন্দ করেন।
তবুও, অ্যাপল এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়্যারলেস অডিওকে মূলধারায় নিয়ে এসেছে—ঠিক যেমনটি তারা ২০০৭ সালে আইফোন দিয়ে টাচস্ক্রিন স্মার্টফোনকে মূলধারায় এনেছিল, বা ১৯৯৮ সালে আইম্যাক দিয়ে ইউএসবি-কে মূলধারায় এনেছিল।
এয়ারপডসের সাফল্যের পরিসংখ্যান
২০১৯ সালে অ্যাপল প্রায় ৫০ মিলিয়ন এয়ারপডস বিক্রি করে।
২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী ট্রু ওয়্যারলেস স্টেরিও (TWS) ইয়ারবাড বাজারের ৩০% দখল করে অ্যাপল।
২০২৪ সালে এয়ারপডস অ্যাপলের অন্যতম বিক্রিত পণ্য, যা আইফোনের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী পণ্য।
এয়ারপডস অ্যাপলের জন্য একটি বিশাল আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে—শুধু হার্ডওয়্যার বিক্রি নয়, এর ইকোসিস্টেম (যেমন Apple Music, iCloud, ইত্যাদি) আরও গ্রাহক ধরে রেখেছে।
সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জ
এয়ারপডস নিয়ে কিছু সমালোচনা অবশ্যই আছে:
১. দাম
এয়ারপডসের দাম $১৫৯ থেকে শুরু, যা অনেকের কাছে সাশ্রয়ী নয়। অ্যাপল পরে এয়ারপডস ২-এর দাম কমিয়েছে, কিন্তু তবুও এটি বাজারের গড় ইয়ারবাডের চেয়ে অনেক বেশি।
২. স্থায়িত্ব
এয়ারপডসের ব্যাটারি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে যায়, এবং তা প্রতিস্থাপন করা যায় না (অন্তত সহজে নয়)। অনেক ব্যবহারকারী অভিযোগ করেন যে ২-৩ বছর পর ব্যাটারি দুর্বল হয়ে যায় এবং নতুন কিনতে হয়।
৩. পরিবেশগত প্রভাব
এয়ারপডস ছোট ও জটিল, যা পুনর্ব্যবহার (Recycle) করা কঠিন। অ্যাপল রিসাইক্লিং প্রোগ্রাম চালু করেছে, কিন্তু এখনও অনেক ইয়ারবাড ল্যান্ডফিলে শেষ হয়।
৪. স্বাস্থ্য উদ্বেগ
ওয়্যারলেস ইয়ারবাডের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন (Bluetooth) নিয়ে কিছু উদ্বেগ আছে, যদিও বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি নিরাপদ। দীর্ঘ সময় উচ্চশব্দে শোনার ফলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা সকল ইয়ারবাডের জন্যই সত্য।
যখন অ্যাপ দিয়ে বদলে গেল যাত্রা ও থাকার জগৎ: উবার, লিফট ও এয়ারবিএনবি
পরবর্তীযখন স্পিকারই বাড়ির প্রাণ হয়ে উঠল: অ্যামাজন ইকো ও অ্যালেক্সা বিপ্লব
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
আইনস্টাইনের সমস্যার পেছনের আকৃতিতে মিললো নতুন বিস্ময়কর পদার্থবিজ্ঞান

বিজ্ঞান বার্তা
১২৫ মিলিয়ন বছরের পুরোনো কুমিরের ফসিলে UV আলোতে মিললো সম্ভাব্য ক্যামোফ্লেজ

বিজ্ঞান বার্তা
ক্ষুদ্র কোষীয় "অ্যান্টেনা" ব্যাখ্যা করতে পারে কেন কিছু শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মায়
বিজ্ঞান বার্তা
'স্টমাক বাগ' প্রতিরোধী কোষকে অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে পাঠায়
বিজ্ঞান বার্তা
'সময় গতি বাড়াচ্ছিল, কমাচ্ছিল, এমনকি থেমেও যাচ্ছিল': পদার্থবিদ ল্যাবে 'মিনি-ইউনিভার্স' তৈরি করে সময়ের একটি মূল তত্ত্ব প্রমাণ করলেন
বিজ্ঞান বার্তা
নাসা ISS-এ পদার্থের পঞ্চম অবস্থা তৈরি করছে, মিনি-ফ্রিজ আকারের quantum ল্যাবের আপগ্রেডের সুবাদে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
