ফ্রাঙ্কেনস্টাইন: যে বই কলেজের আগে শেখাবে সৃষ্টির দায়িত্ব ও একাকীত্বের যন্ত্রণা
Editorial Team১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১:২২ PM১ ভিউ৪ মিনিট পড়া
শেয়ার:

ভূমিকা: যে বই মাত্র আঠারো বছর বয়সে লেখা হয়েছিল
কলেজে পা রাখার আগে আপনি যদি একটি বই পড়তে চান যা আপনাকে শেখাবে—জ্ঞান ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমা কী, সৃষ্টির দায়িত্ব কতটা ভারী, আর সমাজ যাকে গ্রহণ করে না তার পরিণতি কী—তাহলে সেটি হলো মেরি শেলির 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইন'। ১৮১৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি লেখার সময় মেরি শেলির বয়স ছিল মাত্র আঠারো বছর । প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় বেনামে, কারণ সেই সময়ে একজন তরুণী লেখকের পক্ষে এমন ভীতিকর গল্প লেখা গ্রহণযোগ্য ছিল না । কিন্তু আজ, দুইশত বছর পরেও, এই বইটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত, যাকে অনেকে প্রথম প্রকৃত সায়েন্স ফিকশন বলে অভিহিত করেন ।
গল্প: ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ও তার সৃষ্টির ট্র্যাজেডি
গল্পের শুরু আর্কটিকের বরফের মাঝে। অভিযাত্রী রবার্ট ওয়ালটন তার বোনকে চিঠি লিখে জানান—তিনি বরফের মধ্যে এক ক্লান্ত, হিমশীতল মানুষকে উদ্ধার করেছেন। সেই মানুষটি ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন—একজন বিজ্ঞানী, যিনি তাকে তার জীবনের বিভীষিকাময় গল্প শোনান ।
ভিক্টর ছিলেন জেনেভার এক ধনী পরিবারের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পর মৃত্যুকে জয় করার ইচ্ছায় তিনি বিজ্ঞানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইনগোলস্ট্যাড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি মৃতদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জোড়া লাগিয়ে একটি প্রাণী সৃষ্টি করেন। এক ভয়াবহ নভেম্বর রাতে তিনি সেই সৃষ্টিতে প্রাণ সঞ্চার করেন। কিন্তু সৃষ্টিটি যে ভয়ংকর, বিকট—তা দেখে ভিক্টর আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে যান, তাকে ফেলে রেখে ।
সৃষ্টিটি—যার কোনো নাম নেই, যাকে শুধু "দ্য ক্রিয়েচার" বা "দ্য মনস্টার" বলা হয়—নিঃসঙ্গ, পরিত্যক্ত, ক্ষুধার্ত। সে ভাষা শেখে, মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু তার চেহারা এত ভয়ংকর যে সবাই তাকে দেখে পালায়, আক্রমণ করে । সে ভিক্টরের ছোট ভাই উইলিয়ামকে হত্যা করে, আর সেই অপরাধে নির্দোষ চাকরানী জাস্টিনের ফাঁসি হয়। পরে সে ভিক্টরের বন্ধু হেনরিক্লারভালকে হত্যা করে, এবং ভিক্টরের বিয়ের রাতে তার স্ত্রী এলিজাবেথকে হত্যা করে ।
ভিক্টর প্রতিশোধের শপথ নিয়ে সৃষ্টির পিছনে ছোটেন, আর্কটিকের বরফে পৌঁছে ক্লান্তিতে মারা যান। শেষে সৃষ্টিটি ভিক্টরের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে এবং নিজেও মরতে চলে যায় ।
মূল থিম: যা আপনাকে ভাবাবে
প্রথমত, উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমা। ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এবং রবার্ট ওয়ালটন—দুজনেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী, দুজনেই সীমা অতিক্রম করতে চান। ওয়ালটন উত্তর মেরুতে যেতে চান, ভিক্টর জীবন সৃষ্টি করতে চান। কিন্তু শেষে ওয়ালটন তার ক্রুদের কথা শুনে ফিরে যান, আর ভিক্টর কোনো সতর্কবার্তা শোনেন না—ফলে সবকিছু হারান । কলেজে আপনি বড় স্বপ্ন দেখবেন—কিন্তু এই বই শেখাবে, স্বপ্নের সীমা আছে, আর সেই সীমা না মানলে ধ্বংস অনিবার্য।
দ্বিতীয়ত, সৃষ্টির দায়িত্ব। ভিক্টর তার সৃষ্টিকে পরিত্যাগ করেন—কিন্তু সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব তার। সে যদি সৃষ্টিকে ভালোবাসত, শিক্ষা দিত, যত্ন নিত—তাহলে সৃষ্টি হত্যাকারী হতো না। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন শেখায়—যা সৃষ্টি করবেন, তার দায়িত্ব নিতে হবে। কলেজে আপনি জ্ঞান অর্জন করবেন, দক্ষতা তৈরি করবেন—কিন্তু সেই জ্ঞান ও দক্ষতার দায়িত্বও আপনার।
তৃতীয়ত, "মনস্টার" কে? বইয়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আসল মনস্টার কে? ভিক্টর, নাকি তার সৃষ্টি? সৃষ্টিটি হত্যা করেছে বটে, কিন্তু সে হত্যা করেছে কারণ তাকে পরিত্যাগ করা হয়েছিল, ঘৃণা করা হয়েছিল, একাকী রাখা হয়েছিল। ভিক্টর সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু দায়িত্ব নেননি—তিনি কাপুরুষ, স্বার্থপর। কিছু পাঠক মনে করেন, ভিক্টরই আসল মনস্টার । কলেজে আপনি মানুষকে বিচার করবেন—এই বই শেখাবে, যাকে "খারাপ" মনে হয়, তার পিছনের গল্প শুনুন।
চতুর্থত, একাকীত্বের ধ্বংস। সৃষ্টিটি কেবল সঙ্গ চেয়েছিল—একজন বন্ধু, একজন সঙ্গী। সে ভিক্টরকে বলেছিল, তাকে একটি নারী সঙ্গী তৈরি করে দিন। ভিক্টর রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই নারী সৃষ্টি ধ্বংস করে দেন। এই প্রত্যাখ্যানই সৃষ্টিকে পূর্ণ ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয় । এই বই শেখায়—একাকীত্ব মানুষকে ধ্বংস করে। কলেজে আপনি নতুন বন্ধু খুঁজবেন—এই বই মনে করিয়ে দেবে, সঙ্গ, ভালোবাসা, গ্রহণযোগ্যতা—এই তিনটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন।
কলেজে কেন এই বই
কলেজে পা রাখার আগে আপনি হয়তো ভাবছেন—আমি কী শিখব, কী তৈরি করব, কে হব। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন আপনাকে সতর্ক করবে—জ্ঞান ও সৃষ্টির দায়িত্ব এড়িয়ে যাবেন না। ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন একটি সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু তার দায়িত্ব নেননি—ফলে সেই সৃষ্টি তার জীবন ধ্বংস করে দেয়। কলেজে আপনি নতুন জ্ঞান, নতুন ক্ষমতা অর্জন করবেন—কিন্তু সেই ক্ষমতার দায়িত্বও নিতে হবে।
বইটি আরও শেখাবে—সাহস কেবল সীমা অতিক্রম করা নয়; সাহস হলো সীমা চেনা এবং সেই সীমার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা। ভিক্টর সাহস দেখিয়েছিলেন—জীবন সৃষ্টি করে। কিন্তু তিনি প্রজ্ঞা দেখাননি—সৃষ্টির দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কলেজে আপনি দুঃসাহসী হবেন—কিন্তু প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধও শিখবেন।
কীভাবে পড়বেন
বইটি পড়ার সময় একটি ডায়েরি রাখুন। প্রতিটি অধ্যায়ের পর লিখুন—ভিক্টরের কোন সিদ্ধান্তটি আমি আমার জীবনে মেলাতে পারি? আমি কি কখনো কোনো দায়িত্ব এড়িয়ে গেছি? আমার "সৃষ্টি" কী—যা আমি তৈরি করছি, কিন্তু যার দায়িত্ব নিতে ভয় পাচ্ছি? সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি রাখুন—সে খারাপ নয়, সে পরিত্যক্ত। ভিক্টরের প্রতি কঠোর হোন—সে কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়, সে দায়িত্বহীন।
উপসংহার: যে বই আপনাকে দায়িত্ব নিতে শেখাবে
ফ্রাঙ্কেনস্টাইন কেবল একটি ভৌতিক গল্প নয়; এটি জ্ঞান, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও দায়িত্বের একটি গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান। মেরি শেলি মাত্র আঠারো বছর বয়সে এমন একটি বই লিখেছিলেন যা আজও মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়—আমরা কী তৈরি করছি, কেন তৈরি করছি, আর সেই সৃষ্টির দায়িত্ব কে নেবে?
কলেজে পা রাখার আগে এই বইটি পড়ুন। এটি আপনাকে শেখাবে—জ্ঞান অর্জন করা যায়, কিন্তু প্রজ্ঞা অর্জন করতে হয়। ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন জ্ঞানী ছিলেন, কিন্তু প্রজ্ঞাহীন—তাই তিনি ধ্বংস হয়েছিলেন। আপনি জ্ঞান অর্জন করুন, কিন্তু প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধও গড়ে তুলুন। কারণ শেষ বিচারে, সৃষ্টির মূল্য কেবল সৃষ্টিতে নয়; সৃষ্টির মূল্য তার দায়িত্বে।
পূর্ববর্তী
প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস: যে বই আপনাকে শেখাবে মানুষ পড়তে ও সমাজ বুঝতে
পরবর্তীমানুষের অর্থের সন্ধান: যে বই প্রমাণ করে কষ্টের মধ্যেও জীবন অর্থপূর্ণ
সম্পর্কিত সংবাদ
খেলাধুলা ও বিনোদন
দ্য আর্ট অফ ওয়ার: যে বই আপনাকে শেখাবে জয়ের আগে প্রস্তুতির মূল্য
খেলাধুলা ও বিনোদন
টু কিল আ মকিংবার্ড: ক্যাম্পাসে পা রাখার আগে যে বইটি আপনাকে মানুষ করে তুলবে
খেলাধুলা ও বিনোদন
১৯৮৪: সত্য, স্বাধীনতা ও ক্ষমতার বিভীষিকাময় আয়না

খেলাধুলা ও বিনোদন
Educated: শিক্ষাই যেখানে হয়ে ওঠে মুক্তির অস্ত্র
খেলাধুলা ও বিনোদন
অ্যাটমিক হ্যাবিটস: ছোট ছোট অভ্যাস, বিশাল পরিবর্তনের গল্প

খেলাধুলা ও বিনোদন
ডিফাইনিং ডিকেড: বিশের কোঠা কেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দশ বছর
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
