Educated: শিক্ষাই যেখানে হয়ে ওঠে মুক্তির অস্ত্র
Books you should read before college
Editorial Team১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১:০০ PM৫ ভিউ৪ মিনিট পড়া
শেয়ার:

ভূমিকা: যে বই প্রমাণ করে শিক্ষা কেবল ডিগ্রি নয়
কলেজে পা রাখার আগে আপনি যদি একটি বই পড়তে চান যা আপনাকে দেখাবে—শিক্ষা আসলে কী, কেন এটি এত মূল্যবান, এবং কীভাবে এটি একজন মানুষকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে—তাহলে সেটি হলো টারা ওয়েস্টওভারের ‘Educated’। এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, এটি একটি সত্যিকারের জীবনের গল্প। গল্পটির মূল চরিত্র টারা নিজেই—যিনি সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত কোনো শ্রেণিকক্ষে পা রাখেননি, কোনো ডাক্তার দেখেননি, এমনকি জন্ম সনদও পাননি।
‘Educated’ ২০১৮ সালে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষে ওঠে এবং বিল গেটস, ওপ্রাহ উইনফ্রে, বারাক ও মিশেল ওবামার মতো ব্যক্তিত্বদের প্রশংসা পায়। এটি কেবল একটি আত্মজীবনী নয়; এটি একটি আয়না, যা দেখায়—শিক্ষা কীভাবে একজন মানুষকে তার নিজের জীবনকে নতুন চোখে দেখার ক্ষমতা দেয়।
গল্প: বাক্স পিক থেকে কেমব্রিজ
টারা ওয়েস্টওভার জন্মগ্রহণ করেন আইডাহোর গ্রামীণ পাহাড়ি অঞ্চলে, একটি মৌলবাদী মরমন পরিবারে। তার বাবা জিন বিশ্বাস করতেন—সরকার, স্কুল, হাসপাতাল সবই ঈশ্বরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ। তিনি সন্তানদের জন্ম সনদ করেননি, স্কুলে পাঠাননি, ডাক্তারের কাছে নেননি। পরিবারের চার সন্তান—যাদের মধ্যে টারাও ছিলেন—কোনো কাগজপত্র ছাড়াই বড় হয়েছেন, যাতে সরকার তাদের খুঁজে না পায়।
টারার শৈশব কেটেছে জাঙ্কইয়ার্ডে ধাতু কুড়িয়ে, মায়ের ভেষজ ওষুধ তৈরি করে, এবং বাবার তৈরি ‘শেষ বিচারের দিন’-এর জন্য খাবার ও গোলাবারুদ মজুত করে। পরিবারে কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না; টারা বাইবেল, মরমন ধর্মগ্রন্থ পড়ে পড়তে শিখেছেন। কিন্তু একটি জিনিস তিনি অর্জন করেছিলেন—‘যা বুঝি না, তা পড়ার ধৈর্য’।
সতেরো বছর বয়সে টারা প্রথমবার একটি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন। নিজে নিজে গণিত, ব্যাকরণ ও বিজ্ঞান শিখে ACT পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হন ব্রিগ্যাম ইয়াং ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে প্রথমবার তিনি শোনেন হলোকাস্ট, নাগরিক অধিকার আন্দোলন, নেপোলিয়ন—এমন সব ঘটনার কথা, যা অন্য সবার কাছে সাধারণ জ্ঞান। তিনি প্রথম ক্লাসে ফেল করেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি। ধীরে ধীরে তিনি সেরা শিক্ষার্থীদের একজন হয়ে ওঠেন।
এরপর তার যাত্রা অব্যাহত থাকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তিনি গেটস কেমব্রিজ স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। লন্ডনের দ্য ন্যাশনাল পত্রিকা তাকে ডেকেছে ‘আধুনিক রূপকথার নায়িকা’ হিসেবে।
মূল থিম: যা আপনাকে ভাবাবে
প্রথমত, শিক্ষা মানে কেবল তথ্য মুখস্থ করা নয়। টারা যখন কলেজে গিয়ে প্রথমবার বুঝতে পারেন—তার বাবা সম্ভবত মানসিক রোগে ভুগছিলেন, তখন তিনি তার পুরো শৈশবকে নতুন করে দেখতে শুরু করেন। শিক্ষা তাকে সেই দৃষ্টি দিয়েছিল, যা দিয়ে তিনি তার নিজের জীবনকে বাইরে থেকে দেখতে পারতেন। বইটিতে তিনি লেখেন: “শিক্ষা ছিল সেই দৃষ্টিভঙ্গি, যা দিয়ে আমি আমার জীবনকে নতুন চোখে দেখতে পেরেছিলাম, এবং তা বদলানোর ইচ্ছা পেয়েছিলাম”।
দ্বিতীয়ত, পরিবার আর সত্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব। টারার শিক্ষা তাকে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। তার বাবা-মা তার নতুন পরিচয় মেনে নিতে পারেননি। টারা লিখেছেন: “তুমি এটাকে যা খুশি বলতে পারো—রূপান্তর, রূপান্তর, মিথ্যা, বিশ্বাসঘাতকতা। আমি এটাকে বলি শিক্ষা”। এই দ্বন্দ্ব কলেজে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর জীবনে আসে—নিজের নতুন বিশ্বাস আর পরিবারের পুরনো মূল্যবোধের সংঘর্ষ।
তৃতীয়ত, শিক্ষা মানে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। টারার এক শিক্ষক তাকে বলেছিলেন: “তুমি যা-ই হও, যা-ই নিজেকে তৈরি করো, তা সবসময় তোমার ভিতরেই ছিল”। এই কথাটি কলেজে যাওয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য প্রাসঙ্গিক। আপনি নতুন জিনিস শিখবেন, নতুন মানুষ হবেন—কিন্তু আপনার ভিতরের সেই মূল মানুষটি কখনো হারিয়ে যাবে না।
কলেজে কেন এই বই
কলেজে পা রাখার আগে আপনি হয়তো ভাবছেন—আমি কি পারব? এই নতুন পরিবেশে আমি মানিয়ে নিতে পারব? টারার গল্প আপনাকে দেখাবে—সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি থেকেও উঠে আসা সম্ভব। সে যখন প্রথম ক্লাসে ফেল করেছিল, তখন তার হাতে ছিল না কোনো প্রস্তুতি, কোনো ভিত্তি। কিন্তু তার ছিল শেখার ক্ষুধা। সেই ক্ষুধাই তাকে কেমব্রিজ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল।
বিশ্বের অনেক নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘Educated’ পড়ে বলেছেন—এই বই তাদের শিখিয়েছে বিনয়। কারণ আপনি যখন টারার গল্প পড়বেন, তখন বুঝবেন—আপনার যা আছে, তা অনেকে পায়নি। আর আপনার যা নেই, তা অনেকে অসম্ভব পরিশ্রম করে অর্জন করেছে।
কীভাবে পড়বেন
বইটি পড়ার সময় একটি প্রশ্ন মাথায় রাখুন—“আমি কী জানি না, জানি না?” টারা সতেরো বছর বয়সে জানতেন না তিনি কী জানেন না। আপনি হয়তো জানেন—কিন্তু আপনার চারপাশের অনেকেই জানে না। এই বই আপনাকে শেখাবে—অন্যকে বিচার করার আগে বুঝুন, সে কী জানে না, জানি না।
উপসংহার: শিক্ষার প্রকৃত মূল্য
‘Educated’ কেবল একটি আত্মজীবনী নয়; এটি প্রমাণ—শিক্ষা কেবল ডিগ্রি বা চাকরির জন্য নয়। শিক্ষা মানে নিজের জীবনকে নতুন করে দেখার সাহস, সত্যকে চিনতে পারার ক্ষমতা, এবং নিজের পরিচয় নিজে গড়ার স্বাধীনতা। টারা ওয়েস্টওভার লিখেছেন: “শিক্ষা হলো সেই জিনিস, যা আমাকে আমার নিজের গল্প বলার ক্ষমতা দিয়েছে”।
কলেজে পা রাখার আগে এই বইটি পড়ুন। এটি আপনাকে শেখাবে—আপনার পটভূমি আপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; আপনার শেখার ইচ্ছাই তা নির্ধারণ করে। আপনি যদি কখনো মনে করেন “আমি পারব না”, তাহলে মনে করুন টারাকে—যিনি সতেরো বছর বয়সে প্রথমবার ক্লাসরুমে ঢুকেও কেমব্রিজে পিএইচডি করেছেন। শিক্ষা সেই শক্তি, যা কোনো বাধা মানে না।
পূর্ববর্তী
অ্যাটমিক হ্যাবিটস: ছোট ছোট অভ্যাস, বিশাল পরিবর্তনের গল্প
পরবর্তী১৯৮৪: সত্য, স্বাধীনতা ও ক্ষমতার বিভীষিকাময় আয়না
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
জল্লাদখানা বধ্যভূমি: মিরপুরের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের নির্মম ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: যে ইটের দেয়াল আজও বহন করে একাত্তরের শোক

খেলাধুলা ও বিনোদন
জাতীয় স্মৃতিসৌধ: সাত জোড়া দেয়ালে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
চন্দ্রাবতী মন্দির: কবির প্রেম, বিরহ আর মধ্যযুগের বাংলার এক নীরব স্মৃতিচিহ্ন
খেলাধুলা ও বিনোদন
বাঘা মসজিদ: রাজশাহীর মাটিতে সুলতানি বাংলার এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি

খেলাধুলা ও বিনোদন
পুঠিয়া রাজবাড়ি ও মন্দিরসমূহ: রাজশাহীর মাটিতে স্থাপত্য আর ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
