ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: যে ক্যাম্পাসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাস
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নাম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠা: ১ জুলাই ১৯২১
অবস্থান: রমনা, ঢাকা
প্রতিষ্ঠাকালীন কাঠামো: ৩টি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক, ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী ও ৩টি আবাসিক হল
বর্তমান পরিসর: ১৩টি অনুষদ, ৮৩টির বেশি বিভাগ, একাধিক ইনস্টিটিউট, আবাসিক হল ও অর্ধশতাধিক গবেষণা কেন্দ্র
বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে যদি ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, সাহিত্য, আন্দোলন আর তারুণ্যের গল্প একসঙ্গে জড়িয়ে থাকে, সেটি নিঃসন্দেহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সাক্ষী হিসেবেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান অনন্য।
একজন শিক্ষার্থীর কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানে হয়তো স্বপ্নের একটি ক্যাম্পাস। কারও কাছে এটি কাঙ্ক্ষিত একটি বিভাগে পড়ার সুযোগ। আবার কারও কাছে নীলক্ষেতের বই, কার্জন হলের পুরোনো স্থাপত্য, টিএসসির আড্ডা, মধুর ক্যান্টিন, শহীদ মিনার কিংবা পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা। কিন্তু এই পরিচিত দৃশ্যগুলোর পেছনে আছে প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস।
আর সেই ইতিহাসের শুরুটাও কিন্তু খুব সহজ ছিল না।
যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল দীর্ঘ সংগ্রামের পর
১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় সফররত ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে একটি প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। প্রতিনিধি দলে ছিলেন নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ, নবাব স্যার নওয়াব আলী চৌধুরী এবং শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক। এর কয়েকদিন পরই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য স্যার রবার্ট নাথানকে প্রধান করে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ইতিহাসে এই কমিটি ‘নাথান কমিটি’ নামে পরিচিত। ১৯১২ সালেই কমিটি তাদের পরিকল্পনা জমা দেয় এবং পরবর্তী সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন বা স্যাডলার কমিশনের আলোচনাতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আসে।
অবশেষে ১৯২০ সালে পাস হয় Dacca University Act। তার পরের বছর, ১ জুলাই ১৯২১, আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল ৩টি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক, ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী এবং ৩টি আবাসিক হল।
রমনার প্রায় ৬০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন স্যার পি. জে. হার্টগ। শুরু থেকেই এটি ছিল আবাসিক বৈশিষ্ট্যের বিশ্ববিদ্যালয়—যেখানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি হলজীবনও ছিল শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ছোট্ট পরিসরে শুরু হওয়া সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ অনেক বড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে এর রয়েছে ১৩টি অনুষদ, ৮৩টি বিভাগ, ১৩টি ইনস্টিটিউট, ২০টি আবাসিক হল, ৩টি হোস্টেল এবং ৫৬টির বেশি গবেষণা কেন্দ্র।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আন্দোলনেরও সূতিকাগার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনেকে শহীদ হন।
বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক গভীর। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যে ঐতিহাসিক পর্যায়ে পৌঁছায়, তার অন্যতম কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। এই আন্দোলন পরবর্তীকালে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।
তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতে একজন শিক্ষার্থী শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের পাশ দিয়ে হাঁটেন না; তিনি আসলে বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মৃতির মধ্য দিয়েই হাঁটেন।
কার্জন হল থেকে সত্যেন্দ্রনাথ বসু
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের কাছে কার্জন হলের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যের এই ঐতিহাসিক ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর বিজ্ঞান অনুষদের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং আজও এর ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
আর এই কার্জন হল ও বিজ্ঞান শিক্ষার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একজন বিজ্ঞানীর নাম, যাঁকে বিশ্ববিজ্ঞান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে—সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় সত্যেন্দ্রনাথ বসু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর যুগান্তকারী কাজ করেন। ১৯২৪ সালে তাঁর গবেষণাপত্র আলবার্ট আইনস্টাইনের নজরে আসে এবং আইনস্টাইন সেটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে এই কাজ থেকেই গড়ে ওঠে Bose-Einstein statistics-এর ভিত্তি এবং ‘boson’ শব্দটির সঙ্গে তাঁর নাম স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
শুধু গবেষণাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণার অবকাঠামো তৈরিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল। তিনি দীর্ঘ সময় এখানে শিক্ষকতা করেছেন এবং বিজ্ঞান গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে কাজ করেছেন। তাঁর স্মৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে Bose Centre for Advanced Study and Research in Natural Sciences প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
একজন বিজ্ঞানপ্রেমী শিক্ষার্থীর জন্য তাই কার্জন হলের করিডোর দিয়ে হাঁটা নিছক একটি স্থাপত্য দেখার অভিজ্ঞতা নয়—এটি হতে পারে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো একজন বিশ্বমানের বিজ্ঞানীর কর্মস্থলের ইতিহাসকে কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ।
রবীন্দ্রনাথের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি।
১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ঢাকায় আসেন। ১০ ফেব্রুয়ারি কার্জন হলে তিনি The Meaning of Art এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি The Big and the Complex বিষয়ে বক্তৃতা দেন।
জগন্নাথ হলের বার্ষিক সাহিত্যপত্র বাসন্তিকা-র সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের একটি স্মরণীয় যোগসূত্র রয়েছে। তাঁর বিখ্যাত গান “এই কথাটি মনে রেখ, তোমাদের এই হাসি খেলায়”-এর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
অর্থাৎ, বিজ্ঞান থেকে সাহিত্য—বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে জ্ঞানচর্চার পরিধি ছিল শুরু থেকেই বিস্তৃত।
হলজীবন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা এক জগৎ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য এর হলকেন্দ্রিক জীবন। প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই আবাসিক ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
একটি হল মানে শুধু থাকার জায়গা নয়। হলের কমনরুম, পাঠকক্ষ, খাবারের ব্যবস্থা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, সংগঠন এবং বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিদিনের আড্ডা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় আলাদা একটি সামাজিক পরিবেশ।
একজন নতুন শিক্ষার্থীর কাছে প্রথমদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল পরিবেশ কিছুটা অপরিচিত মনে হলেও সময়ের সঙ্গে হলই হয়ে উঠতে পারে দ্বিতীয় বাড়ি। একই সঙ্গে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক, সহপাঠীদের সহযোগিতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রম শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে।
বইয়ের শহরের মধ্যে জ্ঞানের আরেক শহর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এখানে বিপুলসংখ্যক বইয়ের পাশাপাশি সংবাদপত্র, সাময়িকী ও বিভিন্ন জার্নাল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের নিজস্ব গ্রন্থাগার ও পাঠাগারও রয়েছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বই এবং জ্ঞান অনুসন্ধানের অভ্যাস। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে সেই অনুসন্ধানের সুযোগ শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামোতেও গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্ধশতাধিক গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
পড়াশোনার বাইরে যে বিশাল পৃথিবী
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শুধু বইয়ের পাতায় আটকে থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরোপুরি চেনা সম্ভব নয়।
খেলাধুলা, বিতর্ক, ফটোগ্রাফি, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পর্যটন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের জন্য সংগঠন ও কার্যক্রম রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইটি সোসাইটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সায়েন্স সোসাইটি, গবেষণা সংসদসহ নানা সংগঠন শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজেদের আগ্রহ ও দক্ষতা বিকাশের সুযোগ দেয়।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর যদি কেউ ভাবে, “আমার কাজ শুধু ক্লাস করা আর পরীক্ষা দেওয়া”—তাহলে সে ক্যাম্পাসজীবনের বড় একটি অংশই মিস করবে।
ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণে ইতিহাস
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য শুধু সবুজ গাছপালা কিংবা পুরোনো ভবনে নয়; এর বিভিন্ন স্থাপনা ও ভাস্কর্যের মধ্যেও রয়েছে ইতিহাসের গল্প।
অপরাজেয় বাংলা, সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য, শহীদ মিনার, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, স্বাধীনতা সংগ্রাম, ঘৃণাস্তম্ভ, মধুদার ভাস্কর্য, শহীদ ড. মিলন ভাস্কর্য, মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ—এসব স্থাপনা ক্যাম্পাসকে যেমন আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের স্মৃতিও বহন করছে।
আর আছে টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন, কার্জন হল, কলাভবন, জগন্নাথ হলসহ অসংখ্য পরিচিত স্থান—যেগুলোর প্রতিটির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা গল্প জড়িয়ে আছে।
পহেলা বৈশাখ থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি—উৎসবের ক্যাম্পাস
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।
পহেলা বৈশাখে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা, বসন্ত উৎসব, একুশে ফেব্রুয়ারি, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, কনসার্ট, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আন্তঃবিভাগ ও আন্তঃহল প্রতিযোগিতা—সারা বছরই কোনো না কোনো আয়োজন লেগেই থাকে।
পহেলা বৈশাখের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এই ক্যাম্পাসে আসে। রঙ, গান, মুখোশ, আলপনা আর মঙ্গল শোভাযাত্রায় প্রাণ ফিরে পায় পুরো এলাকা।
এই জায়গাটিই আবার ২১ ফেব্রুয়ারিতে হয়ে ওঠে শ্রদ্ধা আর স্মরণের স্থান।
অর্থাৎ একই ক্যাম্পাসে কখনো উৎসব, কখনো প্রতিবাদ, কখনো গবেষণা, কখনো খেলাধুলা—সবকিছুরই সহাবস্থান।
কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এত কাঙ্ক্ষিত?
প্রশ্নটি খুব সহজ—“কেন সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়?”
এর উত্তর শুধু ‘নাম’ দিয়ে দেওয়া যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাস, দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, ঐতিহ্যবাহী শিক্ষক ও গবেষক, বিস্তৃত একাডেমিক পরিসর, গবেষণার সুযোগ, সাংস্কৃতিক পরিবেশ, হলজীবন এবং দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর সাবেক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি—সবকিছু মিলে প্রতিষ্ঠানটির আলাদা একটি মর্যাদা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় নিজেও শিক্ষা, গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং সমাজে তা ছড়িয়ে দেওয়াকে প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেই সাফল্য নিশ্চিত, এমন নয়। বিশ্ববিদ্যালয় তোমাকে সুযোগ দিতে পারে; কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর দায়িত্ব তোমার।
তাহলে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নেবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো—শুধু অনেক পড়লেই হবে।
আসলে এখানে কী পড়ছ, কতটা বুঝে পড়ছ এবং কত দ্রুত প্রয়োগ করতে পারছ—তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ।
তোমার ইউনিট ও সংশ্লিষ্ট গ্রুপের বিষয়গুলো প্রথমে ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে। পাঠ্যবইকে দিতে হবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব। কারণ ভিত্তি দুর্বল রেখে শুধু সহায়ক বই বা প্রশ্নব্যাংক মুখস্থ করলে কঠিন সময়ে সেটি কাজে নাও আসতে পারে।
এরপর আসবে বিগত বছরের প্রশ্ন।
গত বছরের প্রশ্নগুলো শুধু সমাধান করবে না—প্রশ্নের ধরন বোঝার চেষ্টা করবে। কোন অধ্যায় থেকে বেশি প্রশ্ন আসে, কী ধরনের অপশন দেওয়া হয়, কোন জায়গায় বারবার ভুল হচ্ছে—এসব লিখে রাখো।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময় ব্যবস্থাপনা।
পরীক্ষার হলে কোনো একটি প্রশ্নে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করলে পরের সহজ প্রশ্নগুলোও হাতছাড়া হতে পারে। তাই বাসায় মডেল টেস্ট দেওয়ার সময় পরীক্ষার পরিবেশ তৈরি করো। ঘড়ি ধরে পরীক্ষা দাও। এরপর ভুল প্রশ্নগুলো আলাদা করে বিশ্লেষণ করো।
লিখিত অংশ থাকলে শুধু উত্তর জানা যথেষ্ট নয়; দ্রুত ও পরিষ্কারভাবে উত্তর লেখার অভ্যাসও করতে হবে। গণিতভিত্তিক প্রশ্নের ক্ষেত্রে ছোট ছোট অঙ্ক দ্রুত সমাধানের অনুশীলন করো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যাও।
শেষ মুহূর্তে ১২ ঘণ্টা পড়ার চেয়ে নিয়মিত ৪-৫ ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে পড়া অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
শেষ কথা: স্বপ্নটা যদি সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০০ একরের ক্যাম্পাসে পা রাখার স্বপ্ন অনেক শিক্ষার্থীর। কেউ কার্জন হলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে চায়, কেউ চায় প্রিয় বিভাগে ক্লাস করতে, কেউ গবেষক হতে চায়, কেউ বিতর্ক করবে, কেউ সংগঠন করবে, কেউ হয়তো শুধু চায়—একদিন নিজের পরিচয়ের সঙ্গে বলতে, “আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।”
কিন্তু সেই একটি বাক্যের পেছনে থাকে অনেক দিনের পরিশ্রম।
তাই তুমি যদি এখনো ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তাহলে শুধু “ঢাবিতে পড়ব” বললে হবে না। নিজের কাছে প্রশ্ন করো—আজকের দিনটা কি আমাকে সেই স্বপ্নের একটু কাছে নিয়ে গেল?
প্রতিদিনের পড়া, প্রতিটি মডেল টেস্ট, প্রতিটি ভুল থেকে শেখা এবং প্রতিটি ছোট উন্নতি তোমাকে সেই ক্যাম্পাসের দিকে এগিয়ে নেবে।
একদিন হয়তো সত্যিই তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে কার্জন হলের সামনে।
হাঁটবে টিএসসির পথে।
বন্ধুদের সঙ্গে বসবে মধুর ক্যান্টিনে।
২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাবে।
পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেবে।
আর তখন বুঝবে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া নয়; এটি একটি দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠা।
মেঘনাদ সাহা: যে সমীকরণ নক্ষত্রের উত্তাপ আর আলো থেকে তাদের পরিচয় পড়তে শিখিয়েছিল
পরবর্তীরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: পদ্মার পাড়ের সবুজ ক্যাম্পাসে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস লেখা হয়েছে রক্তে
সম্পর্কিত সংবাদ
৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে এআই, রোবোটিক্স ও কারিগরি শিক্ষা
বাংলা শিক্ষা
৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে এআই, রোবোটিক্স ও কারিগরি শিক্ষা

বাংলা শিক্ষা
দক্ষ ও উৎপাদনশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে টিভিইটি (TVET)-কে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য করার আহ্বান জাতীয় সংলাপে

বাংলা শিক্ষা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট): যে স্বপ্নের শুরু গণিতের খাতায়, আর শেষ হতে পারে একজন প্রকৌশলী হিসেবে
বাংলা শিক্ষা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: পুরান ঢাকার হৃদয়ে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর স্বপ্নের এক ক্যাম্পাস
বাংলা শিক্ষা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: পুরান ঢাকার হৃদয়ে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর স্বপ্নের এক ক্যাম্পাস

বাংলা শিক্ষা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: সবুজের রাজ্যে, পাখির শহরে আর স্বপ্নের ক্যাম্পাসে এক নতুন জীবনের শুরু
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
